সংস্কার আলোচনার প্রেক্ষাপট
গত
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রাক্কালে, ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে, স্থানীয় পর্যায়ে
সত্, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান প্রার্থী নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে 'সিটিজেনস ফর
ফেয়ার ইলেকশনস' গঠিত হয় ৷ পরবর্তীতে এর নামকরণ করা হয় 'সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক'
৷ 'সুজন' কোন দাতাপুষ্ট বেসরকারি সংগঠন বা এনজিও নয় ৷ এটি একটি স্বেচ্ছাব্রতী
নাগরিক উদ্যোগ ৷ এর লক্ষ্য হলো সর্বস্তরে সুষ্ঠু নির্বাচন, সজ্জনের শাসন,
প্রার্থীদের সম্পর্কে জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার
ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে জনগণকে সোচ্চার ও সক্রিয় করার মাধ্যমে প্রেসার
গ্রুপ হিসেবে কাজ করা ৷ এ প্ল্যাটফরমের সাথে বর্তমানে দেশের সর্বস্তরের হাজার হাজার
ব্যক্তি জড়িত ৷
জন্মলগ্ন থেকে 'সুজন' ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীদের থেকে বিভিন্ন
তথ্য সংগ্রহ করে জনগণের মাঝে বিতরণ করে ৷ একই সাথে প্রার্থীদেরকে জনগণের মুখোমুখি
করে, যাতে ভোটাররা জেনে-শুনে-বুঝে সত্, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত তথা সজ্জনের
পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে ৷ অনেকগুলো ইউনিয়ন ও পৌরসভা নির্বাচনে এ কাজটি
করা হয় ৷ জাতীয় সংসদের গত তিনটি উপ-নির্বাচনেও একই ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়
৷ এ সকল অভিজ্ঞতা অন্যদের সাথে শেয়ারের লক্ষ্যে অনেকগুলো প্রেস ব্রিফিংয়েরও আয়োজন
করা হয় ৷ স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে
নির্বাচন পরবর্তীকালে অনেক এলাকায় আবারও নির্বাচিত প্রতিনিধি ও জনগণের মখোমুখি
অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ৷ ভোটারদের প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য প্রাপ্তির
অধিকার সম্পর্কিত দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে 'সুজনে'র পক্ষে সংবাদপত্রে অনেক
লেখালেখিও হয় ৷
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পর্কে জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে
'সুজন'-এর কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটেই গত মে মাসে বাংলাদেশ হাইকোর্ট তার আব্দুল মতিন
চৌধুরী এবং অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ মামলার ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন ৷ রায়ে
নির্বাচন কমিশনকে প্রত্যেক প্রার্থী থেকে মনোনয়নপত্রের সাথে নিম্নলিখিত তথ্যাবলী
এফিডেভিট আকারে সংগ্রহ করার এবং এগুলো গণমাধ্যমকে দিয়ে জনগণের মাঝে প্রচার করার
নির্দেশ প্রদান করা হয়:
ক. সার্টিফিকেটসহ প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা;
খ. বর্তমানে তার বিরুদ্ধে রুজুকৃত ফৌজদারি অপরাধের তালিকা (যদি থাকে);
গ. অতীত ফৌজদারি মামলার তালিকা ও ফলাফল;
ঘ. প্রার্থীর পেশা;
ঙ. প্রার্থীর আয়ের উত্স এবং উত্সসমূহ;
চ. অতীতে সংসদ সদস্য হলে জনগণের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার বর্ণনা;
ছ. প্রার্থী ও প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদ এবং দায়-দেনার বর্ণনা; এবং
জ. ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যক্তিগত বা যৌথভাবে এবং কোম্পানী কর্তৃক - যে কোম্পানীতে প্রার্থী চেয়ারম্যান, নির্বাহী পরিচালক কিংবা পরিচালক - গৃহীত ঋণের পরিমান ও বর্ণনা ৷
কোর্টের
মতে, "তথ্য প্রাপ্তির অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার, যা ভোটাধিকারের অন্তর্ভুক্ত ৷"
আদালতের এ যুগান্তকারী রায় জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে
নিঃসন্দেহে একটি বিরাট মাইলফলক ৷
সংস্কার আলোচনার সূচনা
ইউনিয়ন
পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন সংক্রান্ত কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে এবং আমাদের গণতান্ত্রিক
যাত্রাপথকে বেগবান ও আরো অর্থবহ করার লক্ষ্যে প্রায় দু'বছর আগে আমরা 'সুজনে'র
উদ্যোগে রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনার অবতারণা করি ৷ তখন আমাদের প্রধান দু'টি
রাজনৈতিক দল মূলতঃ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি ও তা নাকচ করার
বিতণ্ডায় লিপ্ত ছিল ৷ আমরা আমাদের প্রাথমিক প্রস্তাবে সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীতভাবে নিশ্চিত করার ওপর জোর দেই
৷ তবে আমরা যুক্তি প্রদর্শন করি যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আমাদের রাজনৈতিক
দুর্বৃত্তায়নের সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয় ৷ বরং সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ারই পন্থা ৷ এছাড়া
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আমাদের সংবিধানের "প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র ...
প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ
নিশ্চিত হইবে ৷" (অনুচ্ছেদ-১১) - এ মৌলিক কাঠামোরও পরিপন্থি ৷ তদুপরি তত্ত্বাবধায়ক
সরকার ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস এবং এগুলোর প্রতি জনগণের
আস্থাহীনতারই প্রতিফলন, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সাথে কোনভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়
৷ তাই আমাদের প্রস্তাব আগামী ২/৩ টার্মের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি
ঘটানো ৷
সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান
হিসেবে নির্বাচন কমিশনের সৃষ্টি ৷ তাই আমরা আমাদের প্রাথমিক প্রস্তাবে নির্বাচন
কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করার এবং কমিশনে স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের মনোনয়নের ওপর
অধিক গুরুত্বারোপ করি ৷ 'সুজন'ই প্রথম প্রকাশ্যভাবে নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের
দাবি তোলে ৷ আমরা ভোটার তালিকা নতুন করে প্রণয়নের পরিবর্তে সংশোধনের পক্ষে যুক্তি
উত্থাপন করি ৷ 'সুজনে'র পক্ষেই প্রথম নির্বাচন কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের
একচ্ছত্র আধিপত্যের আইনগত জটিলতার বিষয়টি তুলে ধরা হয় ৷ এ দু'টি ইস্যুতে পরবর্তীতে
বাংলাদেশ হাইকোর্ট তার আলহাজ এ্যডভোকেট মোহাম্মদ রহমত আলী এবং অন্যান্য বনাম
নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য মামলার রায়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেন, যা
বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে ৷
আমরা আমাদের প্রাথমিক প্রস্তাবে গত মে মাসের বাংলাদেশ হাইকোর্টের দেয়া ঐতিহাসিক
রায়টি (আব্দুল মতিন চৌধুরী এবং অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ) বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংসদ
নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করার তথা তাদের
'তথ্যভিত্তিক ক্ষমতায়নের' ওপর জোর দেই, যাতে জনগণ জেনে-শুনে-বুঝে তাদের ভোটাধিকার
প্রয়োগ করতে পারে ৷ আমরাই প্রথম "আমার ভোট আমি দেব, জেনে-শুনে-বুঝে-দেব" - এ
শ্লোগানের প্রবর্তন করি ৷ এছাড়াও উপরিউক্ত রায়টি পরিপূর্ণ ও যথাযথভাবে বাস্তবায়নের
লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ প্রদানের জন্য আমরা আরেকটি রিট দায়ের করি ৷
আমরা
বিশ্বাস করি যে, রাষ্ট্র পরিচালনার গুরু দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের কাঁধে ৷
রাজনীতিবিদদের পক্ষে এ দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলের ৷ বস্তুতঃ
রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চালিকা শক্তি ৷ গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ
রাজনৈতিক দল ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না ৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের দেশে
যথোপযুক্ত রাজনৈতিক দল এখনও গড়ে ওঠে নি ৷ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে কোন
প্রতিষ্ঠানের অধীনে নিবন্ধিত হতে হয় না ৷ তাদের পরিচালনার ক্ষেত্রে কোন আইনি
বাধ্যবাধকতা নেই ৷ ফলে এগুলো হয়ে পড়েছে মূলতঃ ক্ষমতায় যাওয়ার এবং ফায়দা দেয়া-নেয়ার
সিণ্ডিকেটে ৷ তাই আমরা আমাদের প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলের সংস্কার ও তাদের বাধ্যতামূলক
নিবন্ধনেরও দাবি তুলি ৷
আমাদের প্রস্তাবিত সংস্কার বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমের সহায়তায় বেশ কয়েকটি গোলটেবিল বৈঠক
এবং দেশের আনাচে-কানাচে অনেকগুলো কর্মশালা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয় ৷ এ নিয়ে
অনেক লেখালেখিও করা হয় ৷ ফলে সংস্কারের গুরুত্ব অনেকের কাছে সুস্পষ্ট হয় এবং এর
পক্ষে একটি জনমত সৃষ্টি হয় ৷ বর্তমানে রাজধানীর বৈঠকখানা থেকে গ্রাম-গঞ্জের চা-স্টল
পর্যন্ত সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা বিস্তৃত ৷ গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এ ব্যাপারে
বিশেষ ভূমিকা পালন করেন ৷ উল্লেখ্য যে, জনমত সৃষ্টির ফলে বিরোধী ১৪-দল তাদের
'অভিন্ন ন্যূনতম ২৩-দফা কর্মসূচি'তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাথে নির্বাচন কমিশনের
সংস্কারের দাবিও অন্তর্ভুক্ত করেন ৷ একই সাথে তারা "সন্ত্রাসী ও গডফাদারকে চিহ্নিত
করে তাদের গ্রেফতার ও বিচার করা হবে, তাদের কোনক্রমেই রাজনৈতিক দলে গ্রহণ ও মনোনয়ন
দেয়া যাবে না" - এমন আশ্বাস দেন, যদিও কিভাবে তা করা হবে আমাদেরকে তা বলা হয় নি ৷
প্রথম দিকে নাকচ করে দিলেও, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও গত সংসদ অধিবেশনের সমাপনী
ভাষণে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন ৷ যার ফলে
বর্তমানে এ নিয়ে চিঠি আদান-প্রদান চলছে ৷ গত ডিসেম্বর মাসে দেশের ৩৬জন বিশিষ্ট
নাগরিক জঙ্গিবাদ দমন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের
মাধ্যমে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির দাবি করে একটি বক্তব্য প্রদান করেন ৷ অতি সম্প্রতি
সিপিডি, প্রথম আলো ও দি ডেইলি স্টার সংস্কার বিষয়ে একটি আলোচনার সূত্রপাত করে, যার
মাধ্যমে দেশের বরেণ্য নাগরিকগণ এতে সম্পৃক্ত হন ৷ আমরা আনন্দিত যে, সংস্কার
প্রস্তাব উত্থাপন, এনিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা পরিচালনা ও এর পক্ষে জনমত সৃষ্টির
ক্ষেত্রে 'সুজন' গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে ৷ এজন্য অবশ্য আমরা
সংবাদমাধ্যমের কাছে কৃতজ্ঞ ৷
রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাবের সারকথা
একটি
গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও অসামপ্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে বহু আত্মত্যাগের
বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি ৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের গণতন্ত্র হয়ে
গিয়েছে নির্বাচন-সর্বস্ব - আমরা 'একদিনের গণতন্ত্রে'র ফাঁদে আটকা পড়ে গিয়েছি ৷
অভিজ্ঞতায় বলে, নির্বাচন-সর্বস্ব গণতন্ত্র ইজারাতন্ত্রেরই নামান্তর ৷ যার
অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট আর দখলদারিত্ব ৷ এমনি প্রক্রিয়ায়
রাজনীতি আজ আমাদের দেশে রাতারাতি ধনী হওয়ার এক অসাধু ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে এবং জন্ম
দিয়েছে ক্ষমতায় যাওয়ার এক অশুভ প্রতিযোগিতা ৷ রাজনীতি হয়ে পড়েছে কালোটাকার মালিক,
সন্ত্রাসী, ঋণ খেলাপী, বিল খেলাপী, ভোট জালিয়াতকারী তথা দুর্বৃত্তদের আখড়া ৷ অর্থের
বিনিময়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা 'ক্রয়ে'র মোক্ষম উপায় ৷
নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি (democratic
procedure)
৷ তবে নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশমাত্র, শেষ কথা নয় ৷
গণতন্ত্রকে কার্যকর করার জন্য আরো প্রয়োজন গণতান্ত্রিক রীতিনীতির (democratic
principles)
চর্চা ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান (democratic
institutions)
৷ আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথকে সুসংহত করতে হলে প্রয়োজন একযোগে গণতান্ত্রিক
পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানের আমূল সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক নিয়মনীতির চর্চা, যার লক্ষ্য
হবে একদিকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং একই সাথে সজ্জনদের রাষ্ট্র
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা ৷ কারণ শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনই সজ্জনের
শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয় ৷
গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এবং দেশব্যাপী বহু আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে কাঙ্ক্ষিত
সংস্কারের লক্ষ্যে আমরা নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করছি ৷ এর মূল লক্ষ্য হলো
সংস্কার বিষয়ে চলমান বিতর্ক অব্যাহত রাখা, যা থেকে একটি জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হবে ৷
অনেকগুলো প্রস্তাবই হয়তো এখনই বাস্তবায়ন করা যাবে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদীভাবে
এগুলোর বাস্তবায়ন ছাড়া আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে না এবং
পরিপক্কতা অর্জন করবে না ৷ আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগেই যেগুলো বাস্তবায়ন করা
জরুরি সেগুলো তারকা (*) চিহ্নিত করা হয়েছে ৷
১.০
গণতান্ত্রিক পদ্ধতি (অর্থাত্ নির্বাচন)
১.১ ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিতকরণ
১.২ নির্বাচনী ব্যয় হ্রাস এবং এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ
১.৩ নির্বাচনী বিরোধ/মামলা দ্রুততার সাথে নিস্পত্তিকরণ
১.৪ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান
২.০
গণতান্ত্রিক নিয়মনীতি
২.১ দুর্বৃত্তদেরকে নির্বাচন ও ক্ষমতার থেকে দূরে রাখার বিধান
২.২ ভোটারদের তথ্যভিত্তিক ক্ষমতায়ন
২.৩ রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন
৩.০ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান
৩.১ রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার
৩.২ নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালীকরণ
৩.৩ জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিত্বশীলতা ও কার্যকারিতা
নিশ্চিতকরণ
৩.৪ শাসন প্রক্রিয়ার বিকেন্দ্রীকরণ ও সংস্কার
৩.৫ সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রশাসনিক সংস্কার
রাজনৈতিক সংস্কার অর্জনে নাগরিক সমাজের করণীয়
এটি
সুষ্পষ্ট যে, বহু আত্মত্যাগ ও যে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল তা
বাস্তবে রূপায়িত করতে হলে আমাদের রাজনীতিতে বহু পরিবর্তন প্রয়োজন ৷ প্রয়োজন আমাদের
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আমূল সংস্কার ৷ এ সকল পরিবর্তন আপনা থেকে আসবে না ৷
রাজনীতিবিদরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েও তা করবেন না ৷ কারণ বিরাজমান লুটপাটতন্ত্রের
পরিবর্তন তাদের স্বার্থের পরিপন্থি ৷ তাই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটাতে হলে নাগরিকদেরকে
সংগঠিত ও সোচ্চার হতে হবে ৷ তাদেরকে নিতে হবে প্রেসার গ্রুপের ভূমিকা ৷ কারণ একটি
রাষ্ট্রে নাগরিকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদ আর নেই ৷ অর্থাত্ যে দেশে নাগরিকরা
সক্রিয়, সোচ্চার ও তাদের করণীয় করে সে দেশে অনাচার-অবিচার কম ৷ সে দেশে সুশাসন
প্রতিষ্ঠিত হয় ৷
নাগরিকদের মধ্যে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে
পারেন ৷ তারা সর্বক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বড় অবদান রাখতে পারেন
৷ কারণ বর্তমান বিশ্বে প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও আইন পরিষদের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে
রাষ্ট্রের চতুর্থ ব্রাঞ্চ হিসেবে ধরে নেয়া হয় ৷ সংবাদকর্মীরা বিশেষভাবে নির্বাচনে
প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্য জানার আইনগত অধিকার অর্জনে সহায়তা করতে পারেন ৷
প্রার্থীদের দেয়া এফিডেভিট এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী অন্যান্য তথ্য প্রকাশে
নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং প্রাপ্ত তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে
পারেন ৷ প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তারা অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি করতে পারেন ৷ একই
সাথে সংস্কার ইস্যুগুলো সহজবোধ্য করে জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারেন ৷
আমাদের
রাজনৈতিক দলগুলোতে একটি শুদ্ধি অভিযান আজ অত্যন্ত জরুরি ৷ যাতে রাজনীতি আবারও হয়ে
উঠতে পারে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার ক্ষেত্রের পরিবর্তে দেশপ্রেম প্রদর্শনের
এবং জনকল্যাণ সাধনের উত্কৃষ্ট মাধ্যম ৷ রাজনীতিবিদরা মানব কল্যাণে সোচ্চার ও
জনগণের ন্যায্য অধিকারের রক্ষক ৷ সত্ ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদদেরকে এ ব্যাপারে
এগিয়ে আসতে হবে ৷ দলের সকল নেতা-নেত্রী এবং নির্বাচনে প্রার্থী তাদের সম্পদ ও
দায়-দেনার সঠিক হিসাব যাতে প্রকাশ করে সে ব্যাপারে তাদেরকে সোচ্চার হতে হবে ৷
নেতা-নেত্রীদের যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে ৷ পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে
অবস্থান নিতে হবে ৷
আমাদের সমাজ সচেতন নাগরিকদেরকেও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে এগিয়ে আসতে হবে ৷
তারা জনগণকে স্বচ্ছ রাজনীতি ও পরিচ্ছন্ন প্রশাসনের দাবিতে জাগিয়ে তুলতে ও সংগঠিত
করতে পারেন ৷ একই সাথে তারা সংস্কার ইস্যুগুলো আরও সুস্পষ্ট করতে পারেন ৷ সচেতন
নাগরিকদের আজকের উদ্যোগ ও উদ্যোগহীনতার ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করবে আগামী দিনের
বাংলাদেশ কেমন হবে ৷ কারণ ফ্রিডমও ফ্রি নয় - এর জন্য প্রয়োজন নাগরিকের নিরন্তর
সতর্ক দৃষ্টি ৷ আমরা আশা করি যে, আমাদের সচেতন ও চিন্তাশীল নাগরিকগণ সোচ্চার হবেন
এবং আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন তথা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে কলুষমুক্ত করতে
একটি ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করবেন ৷ আমাদের
জাতীয় কবির ভাষায় - "আমরা যদি না জাগি মা/কেমনে, সকাল হবে?/তোমার ছেলে উঠলে
মাগো/রাত পোহাবে তবে ৷"
উপরোক্ত সুপারিশগুলো একটি প্রাথমিক প্রস্তাব মাত্র, শেষ কথা নয়
৷
এর মূল লক্ষ্য হলো সংস্কার বিষয়ে তুমুল বিতর্কের সূচনা করা, যা থেকে একটি জাতীয়
ঐকমত্য সৃষ্টি হবে
৷
আমরা আশা করি যে, আমাদের সচেতন ও চিন্তাশীল নাগরিকগণ সোচ্চার হবেন এবং প্রয়োজনীয়
সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করৰেন
৷
আগামী সংসদ নির্বাচনে সত্, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান প্রার্থী নির্বাচনের মাধ্যমে
সত্যিকারের জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে 'সুজন' গত কয়েক বছর থেকে গণমাধ্যমের
সহায়তায় অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে দেশব্যাপী আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে
৷ সুষ্ঠু নির্বাচন
নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নাতীতভাবে নিরপেক্ষ এবং নির্বাচন
কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করা যার অন্যতম
৷ তবে সুষ্ঠু নির্বাচনই
যথেষ্ট নয় - সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সজ্জনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক
৷
রাজনৈতিক দলসমূহ যাতে যথাযোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন প্রদান করে সে লক্ষ্যে দলের সংস্কার
দরকার
৷ দলকে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও
জবাবদিহিমূলক হওয়া দরকার, যা নিশ্চিত করবে দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন
৷ ভোটার লিষ্টের
নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিতকরণ, নির্বাচনী ব্যয় হ্রাস, না-বাচক ভোটের বিধান ইত্যাদিও
সুজনের সংস্কার প্রস্তাবের অন্তর্ভূক্ত
৷
সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে 'সুজন' নানামূখী কর্মসূচী গ্রহন
করেছে
৷ আগামী ২২ এপ্রিল দেশব্যাপী -
ইউনিয়ন থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত - একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠান এর অন্যতম
৷ এ মানববন্ধন
কর্মসূচীকে সফল এবং প্রস্তাবিত সংস্কার কর্মসূচী নিয়ে দেশব্যাপী একটি বিতর্ক
অনুষ্ঠান ও এ সমস্ত বিষয়গুলো নিয়ে একটি ঐক্যমত্যে পৌঁছার লক্ষ্যে নাগরিক সমাজের
করণীয় চিহ্নিত করতে 'সুজন' একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছে ৷ নাগরিক দায়িত্ববোধ
থেকে এতে অংশগ্রহনের জন্য আপনাকে বিনীত অনুরোধ করছি ৷
রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান অসহিঞ্চুতা, পারস্পরিক অসহযোগিতা, সহিংসতা ও দুর্বৃত্তায়ন
জাতি হিসেবে আমাদেরকে এক অনিশ্চিত ও সংকটাপন্ন অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে ৷ এ
অবস্থার উত্তরণ না ঘটাতে পারলে আমাদের বহু কষ্টার্জিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চরম
হুমকির সম্মুখীন হবে এবং আমাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে ৷ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো
ক্ষমতায় যাওয়ার সোপান হিসেবে শুধুমাত্র নির্বাচন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত এবং তত্ত্বাবধায়ক
সরকার ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি ও তা নাকচ করার বিতণ্ডায় লিপ্ত ৷
(সহায়তায় এবং অনেক চিন্তাশীল নাগরিকদের লেখনির মাধ্যমে আমরা দেশের আনাচে-কানাচে
অনেক কর্মশালা ও মতবিনিময় সভা আয়োজন করি, 'দি ডেইলি স্টার'-এর
১৪তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে (১৪/১/০৫) নির্বাচনী সংস্কারের ওপর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ
করে ৷ যা সংস্কারের পক্ষে একটি জনমত সৃষ্টিতে সহায়তা করে ৷)
|
For technical
information contact:
webmaster |