“নির্বাচন কমিশন সংস্কারের জন্য যা প্রয়োজন” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা

 

  গত ১৬ নভেম্বর ২০০৬ ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’ ও ‘রিপোটার্স ফোরাম ফর ইলেকশন এণ্ড ডেমোক্রেসী’ (আর.এফ.ই.ডি)-এর যৌথ উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাব-এর কনফারেন্স কক্ষে একটি গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এ এসএম শাহজাহান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল - “নির্বাচন কমিশন সংস্কারের জন্য যা প্রয়োজন”। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব মোঃ হাফিজ উদ্দিন খান-এর সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। ‘রিপোটার্স ফোরাম ফর ইলেকশন এণ্ড ডেমোক্রেসী’র সভাপতি জনাব আশীস সৈকত প্রথমেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন। স্বাগত বক্তব্যে উপস্থিত সকলকে তিনি ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানান।

গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী জনাব আবদুল মতিন খসরু, সাবেক মন্ত্রী জনাব শেখ শহিদুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব জনাব এম. মুজিবুল হক, সাবেক সাংসদ জনাব জি এম কাদের, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত মোঃ জমির, মেজর জেনারেল (অবঃ) সৈয়দ এম ইব্রাহীম, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. কাজী খলিকুজ্জামান, বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব আতাউস সামাদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, পূবালী ব্যাংক-এর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব খন্দকার ইব্রাহীম খালিদ, উন্নয়ন সমন্বয়-এর চেয়ারম্যান ড. আতিউর রহমান, সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক জনাব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি জনাব অজয় রায়, এলডিপি নেতা জনাব ফিরোজ এম হাসান, চিত্রনায়ক ইলিয়াছ কাঞ্চন, বিশিষ্ট আইনজীবী জনাব শাহদীন মালিক, এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি জনাব আবদুল আওয়াল মিন্টু, নারী নেত্রী ড. হামিদা হোসেন, এফবিসিসিআই-এর সভাপতি জনাব মীর নাছির হোসেন, ব্রিগ্রেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক মূখ্য বার্তা সম্পাদক জনাব রফিকুল ইসলাম সরকার, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জনাব জাকির হোসেন প্রমুখ।

জনাব এ এসএম শাহজাহান তার বক্তব্যে বলেন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বড় রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার-এর বিষয়ে আগ্রহী নয়। এছাড়া তিনি প্রশাসন ও আইন প্রণয়ন ব্যবস্থাকে জরুরি ভিত্তিতে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার আহবান রাখেন। জনাব মোঃ হাফিজ উদ্দিন খান তার বক্তব্যে সার্বিক সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন পদ্ধতি বদলাতে হবে।

মূল প্রবন্ধে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সংস্কারের দাবি আজ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুণর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের নির্বাচন কমিশনের বর্তমান বেহাল অবস্থা। স্বার্থান্বেষী ও অযোগ্য ব্যক্তিদের মনোনয়ন এবং পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের নির্বাচন কমিশন আজ একটি অকার্যকর ও গণবিরোধী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনই যেন আজ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রধান অন্-রায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য অবশ্যই বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের বাদ দেয়ার পন্থা খুঁজে বের করতে হবে বলে। তবে নির্বাচন কমিশনকে একটি যথার্থ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য ব্যক্তিকে বাদ দেয়াই যথেষ্ট নয়। একইসাথে প্রয়োজন হবে নির্বাচন কমিশনের পদ্ধতিগত কাঠামোর দুর্বলতা নিরসন এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বৃদ্ধি।

জনাব আবদুল মতিন খসরু রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এক সাহেব দুই সাংবিধানিক পোস্ট দখল করে রাখতে পারেন না। অবিলম্বে তিনি তাঁকে পদত্যাগের অনুরোধ জানান। জনাব শেখ শহিদুল ইসলাম তার বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সদাচারণের কথা উল্লেখ করে বলেন, দলগুলো নিবন্ধন করে না। এটা হওয়া প্রয়োজন। জনাব মুজিবুল হক রাষ্ট্রপতিকে তিনি দলীয় প্রধানদের নিয়ে সমঝোতার উদ্দেশ্যে লাগাতার সংলাপ-এর কথা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেন। জনাব জি.এম কাদের আগামী নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পর্কে আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই চলবে না। চাই সদূর প্রসারী সংস্কার। জনাব মোঃ জমির আজিজের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা উল্লেখ করেন।

সৈয়দ এম ইব্রাহীম বলেন, গণতান্ত্রিক অবস্থা বজায় রাখতে হলে নির্বাচন হতে হবে। তা না হলে সংঘাত সৃষ্টি হবে বলে তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
ড. কাজী খলিকুজ্জামান দেশব্যাপী গণ আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান রেখে বলেন, বর্তমান সমস্যার সমাধান না হলে, অকার্যকর সরকার এবং সর্বশেষ আমরা একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হব। জনাব আতাউস সামাদ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের আহবান ও এ প্রসঙ্গে যুক্তি প্রদর্শন করা যেতে পারে। ডাঃ জাফরুল্লাহ সুজন-এর কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করতে হবে এবং ১৫ দিনের মধ্যে কাউন্সিলের সিদ্ধান্- দিতে হবে বলে তিনি দাবি জানান। জনাব ইব্রাহীম খালেদ প্রশ্ন রেখে বলেন, আজিজ সাহেব কেন যাচ্ছেন না? এর পেছনে যে খুঁটির জোর আছে তা প্রকাশ করে দেয়া প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, সংবিধানের হৃদপিণ্ড ছেদ করা হয়েছে - রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্ট হয়ে একনায়ক হয়ে পড়েছেন।

জনাব শাখাওয়াত হোসেন বলেন, উপদেষ্টাগণকে প্রথম কাজটি করতে বলুন এবং করতে দিন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো আসল সংস্কারের কথা বলছে না। তিনি আরো উল্লেখ করেন, অস্ত্রের ব্যাপারে কিছুই করা হয় নি, জঙ্গীবাদ শেষ হয়ে গেছে, আইন শৃঙখলা সুষ্ঠু করতে হবে - তা না হলে অনিশ্চিত ভবিষ্যত। জনাব ফিরোজ হাসান বলেন অসুস্থ নির্বাচন কোন সমাধান দিতে পারবে না। জনগণকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে আন্দোলন সফল হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। জনাব মীর নাসির হোসেন সামগ্রীক সংস্কার প্রয়োজন বলে মন্-ব্য করেন। জনাব ড. হামিদা হোসেন সংস্কারের জন্য দুই দলকে এগিয়ে আসার আহবান রেখে বলেন এর জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে চাপ অব্যাহত থাকবে। ড. শাহদীন মালিক বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারদের পদ এখন আর আধা বিচার বিভাগীয় পদ নয়। তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রপতি একটি গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আজিজ ও মাহফুজুর রহমানকে অপসারণ করতে পারেন।

জনাব আতিউর রহমান বলেন, যে সকল উদ্যোগ শুরু হয়েছে সেগুলোকে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। জনাব ইলিয়াছ কাঞ্চন বলেন, জনগণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, অজিজের বিরুদ্ধে নয়। আজিজ’কে সরিয়ে দেয়াই সমাধান নয়। হাসিনাকে ক্ষমতায় বসানোর জন্যই কী আন্দোলন। আন্দোলন করে যেতে হবে। জনাব আবদুল আওয়াল মিন্টু বলেন, নির্বাচন হবে কি না, এ বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। দুই দলকে তিনি চোর-বদমাইশের পার্টি উল্লেখ করে, অবিলম্বে নির্বাচন পদ্ধতি ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কার করার দাবি জানান। জনাব রফিকুল ইসলাম সরকার গণ-আন্দোলনে আমাদের সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে বলে মন্-ব্য করেন।

‘রিপোটার্স ফোরাম ফর ইলেকশন এণ্ড ডেমোক্রেসী’র সভাপতি জনাব আশীস সৈকত উপস্থিত সকলের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে গোলটেবিল আলোচনার সমাপ্তি ঘটে। এছাড়া গোলটেবিলে উত্থাপিত সুজনের প্রস্-াবসমূহের প্রতি উপস্থিত সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন।
 
     

Home  / Feedback  / Subscribe

For technical information contact: webmaster
This site is developed and maintained by The Hunger Project-Bangladesh