| |
সম্পাদকীয়
সংবাদপত্রের সাম্প্রতিক রিপোর্ট থেকে এটি
সুস্পষ্ট যে, আমরা দেশব্যাপী জরুরী অবস্থা ঘোষণা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছি। এর
জন্য আইনের খসড়া পর্য ন্ত তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেনাবাহিনীকে দু’ঘন্টার মধ্যে
মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
এটি অত্য ন্ত দুঃখজনক যে, বহু কষ্টের বিনিময়ে দেড় দশক আগে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র আজ
চরম হুমকির সম্মুখীন। আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে এ অবস্থার জন্য তিনটি বিষয়কে প্রধান
কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক রীতি-নীতি চর্চার
অভাব। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিতে ব্যাপক অসততা ও অযোগ্যতা এবং তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক
প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা।
শিশুকে যেমন আদর যত্ন করে বড় করতে হয়, শিশু গণতন্ত্রকেও লালন-পালন করে শক্ত ভিতের
উপর দাঁড় করাতে হয়। তাই ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার সাথে প্রয়োজন রাজনীতিবিদদের
গণতান্ত্রিক আচরণ ও শিষ্টাচার প্রদর্শন। রাজনীতিবিদরা গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি মেনে
চলে পরস্পরের প্রতি সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করলেই ঐক্যমত গড়ে তোলা সম্ভব।
গণতন্ত্র একটি দ্বন্দ্বমূলক ব্যবস্থা এবং এ ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে কতকগুলো
মৌলিক বিষয়ে মতৈক্য হওয়া অত্য ন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের গণতন্ত্রের প্রতি হুমকির অন্যতম কারণ হলো রাজনীতিতে ব্যাপক অসততা ও অযোগ্যতা।
রাজনীতি আজ কালো টাকা, পেশি শক্তি ও দুর্বৃত্তদের স্বর্গরাজ্য। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়
অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিরা রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে
ক্রমাগতভাবে বিতাড়িত হচ্ছে।
আমাদের গণতান্ত্রিক সংকটের আরেকটি বড় কারণ হল গণতন্ত্র সুরক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর
দুরাবস্থা। নির্বাচন কমিশন এখন একটি চরম অকার্যকর ও গণবিরোধী প্রতিষ্ঠানে পরিণত
হয়েছে। রাজনৈতিক দলের অবস্থা আরো বেহাল। দুর্নীতির আখড়ায় এবং যেকোন প্রকারে ক্ষমতায়
যাওয়ার সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।
উপরিউক্ত তিনটি হুমকি থেকে গনতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংকট নিরসনে যুথবদ্ধ হতে হবে গোটা
জাতিকে। না হলে সৃষ্টি হবে সংঘাত ও সহিংসতা। পরিণতি বিকাশমান গণতন্ত্রের অপমৃত্যু।
জেঁকে বসবেঅগণতান্ত্রিক পন্থা। আমরা কি তা চাই?
আমরা তা চাইতে পারি না। বর্তমান সংকটে তাই বর্ষীয়ান রাষ্ট্রপতি রেফারি হিসেবে নয়
জাতির একজন বিবেকবান অভিভাবক হিসেবে তিনি তাঁর নৈতিক অধিকার কাজে লাগিয়ে গ্রহণ করতে
পারেন সাহসী পদক্ষেপ। এর ফলে তৈরি হতে পারে রাজনৈতিক সমঝোতা। ১৫ কোটি মানুষ
রাষ্ট্রপতির সেই দৃঢ় ভূমিকার আকাঙক্ষায় অপেক্ষমান। আশা করি তিনি এ চ্যালেঞ্জ
মোকাবেলায় সমর্থ হবেন।
|
সম্পাদনা
ড. বদিউল আলম মজুমদার
সুজন সচিবালয় : ৩/৭ আসাদ এভিনিউ, মোহাম্মদপুর,
ঢাকা-১২০৭, বাংলাদেশ
ফোন : ৮১১২৬২২, ৮১২৭৯৭৫
ফ্যাক্স : ৮১১৬৮১২
ওয়েবসাইট : www.shujan.org
|
|
সুজনের প্রথম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত
গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৬-এ ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনীয়ার্স মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত
হলো ‘সুজনে’র জাতীয় সম্মেলন। গণতন্ত্র, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার
লক্ষ্যে ২০০২ সালে সৃষ্ট এই নাগরিক উদ্যোগের প্রথম জাতীয় সম্মেলন ছিল এটি। বিপুল
উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সুজনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও
স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন সারাদেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটির ছয়
শতাধিক প্রতিনিধি এবং অনেক দেশবরেণ্য ব্যক্তি। অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় দুই পর্বে
দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীগণ খোলামেলাভাবে মতামত ব্যক্ত করেন।
সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল: (ক) নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুজনের
কর্মসূচি ও কর্মকৌশল নির্ধারণ; (খ) বাংলাদেশের নির্বাচনী তথা রাজনৈতিক সংস্কার
প্রস্তাব, আইন ও বিধি সংস্কার প্রস্তাব চূড়া ন্তকরণ, এবং (গ) রাজনৈতিক দলসমূহের
নির্বাচনী ইশতেহারে সন্নিবেশনের জন্য ইস্যুসমূহ চিহ্নতকরণ।
সুজনের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় কনভেনশনের প্রথম
অধিবেশনের শুভ সূচনা হয় জাতীয় সঙ্গীতের মধ্যদিয়ে। এই অধিবেশনে মঞ্চে উপবিষ্ট
ছিলেন-সুজন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি বিচারপতি কাজী এবাদুল হক,
সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, কোষাধ্যক্ষ জনাব বদরে আলম খান, নির্বাহী সদস্য জনাব
সৈয়দ আবুল মকসুদ ও অধ্যক্ষ মাহফুজা খানম, গণস্ব্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান
ড.জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী, আইন ও শালিস কেন্দ্রের উপদেষ্টা ড. হামিদা হোসেন, বিশিষ্ট
কলামিস্ট জনাব জগলুল আহমেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ মানবাধিকার সমন্বয় পরিষদের সভাপতি এ
এইচ এম নোমান, অধ্যাপক সিকান্দার খান, অধ্যক্ষ আ. আ. আ. আসাদুজ্জামান, অধ্যক্ষ
মোমিনুল হক চৌধূরী, এডভোকেট ফজলে আলী খান, অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমান, অধ্যাপক
মোহাম্মদ হোসেন খান, অধ্যাপক সাইদুর রহমান, অধ্যাপক হালিমুজ্জামান, জনাব মুকুল
মোস্তাফিজুর রহমান, এ্যাডভোকেট মায়া ভৌমিক, অধ্যাপক সাইয়্যিদ মুজিবুর রহমান, জনাব
খলিলুর রহমান, জনাব মাহবুব আল তমাস, জনাব ইসলাম নূর, জনাব আ ন ম সালেহ্, জনাব
ফারুক আহমেদ, কাজী হাফিজ আহমেদ, এ্যাডভোকেট খান মোহাম্মদ খালেদ, জনাব হেমায়েত
উদ্দিন হিমু, জনাব মোহাম্মদ আলী খান প্রমুখ।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ স্বাগত বক্তব্যে সুজন প্রতিষ্ঠার পটভূমি এবং দেশব্যাপী
সুজনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলেন- আপনাদের নেতৃত্বে আমরা সংস্কারের
দাবিতে জনমত সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছি। নিঃসন্দেহে আমাদের উদ্যোগ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়
স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে সাহায্য করবে। সামগ্রীক অবস্থার ইতিবাচক পরিবতর্নের লক্ষ্যে
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিবর্তন আনার জন্যও আমাদেরকে
কাজ করতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
স্বাগত বক্তব্য শেষে ড. বদিউল আলম মজুমদার সারা দেশে অনুষ্ঠিত ৮টি অঞ্চলভিত্তিক
কর্মশালার সুপারিশমালার আলোকে সুজনের কর্মসূচি, “রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাব”, ‘‘আইন
ও বিধিমালা সংস্কার প্রস্তাব’’ এবং রাজনৈতিক দলসমূহের নির্বাচনী ইশতেহারে
সন্নিবেশনের জন্য ‘‘নির্বাচনী ইশতেহার-এর জন্য বিবেচ্য বিষয়সমূহ’’ উপস্থাপন করেন।
পরে উত্থাপিত প্রস্তাবসমূহ সম্পর্কে সকলের সুপারিশ এবং মতামত গ্রহণ করা হয়।
অংশগ্রহণকারীদের মতামতের ভিত্তিতে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুজনের
কর্মসূচি হিসাবে নির্ধারিত করা হয়-নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং
এগুলো নিয়ে ডাটা বেইজ তৈরি ও ওয়েব সাইটে প্রদর্শন; নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকা প্রণয়নে
সহায়তাকরণ সুজনের রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে জনমত সৃষ্টি ও এডভোকেসি করা;
সৎ ও যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন এবং নির্বাচনে প্রচারাভিযান; অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন
অনুষ্ঠানে ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে নাগরিকদের সচেতন করা, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে
সম্ভাব্য অনাকাঙিক্ষত ঘটনা রোধ এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ ইত্যাদি।
রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে
উত্থাপিত প্রস্তাবসমূহ কিছু সংযোজনসহ গ্রহণ করা হয়।
এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পায় সেগুলো হচ্ছে-সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য
তত্ত্বাবধায়ক সরকার, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসমূহের
বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা, রাজনৈতিক
দলসমূহের প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মতামত গ্রহণের
বাধ্যবাধকতা, ‘না’ ভোটের বিধান প্রবর্তন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন, কমপক্ষে
৩ বছর দলীয় সদস্য হিসাবে কাজ করার পর মনোনয়ন প্রাপ্তির বিধান প্রবর্তন ইত্যাদি।
সংস্কার প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নে যে সকল আইন ও বিধি-বিধান প্রণয়ন ও সংশোধন করা
প্রয়োজন সে সম্পর্কে প্রনীত প্রস্তাবসমূহও কনভেনশনে গ্রহণ করা হয়।
-দিলীপ কুমার সরকার ও সরস্বতী রানী পাল |
|