| জনাব এ এম এ মুহিত সুষ্ঠু নির্বাচন ও
গণতন্ত্রের স্বার্থে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন (প্রথম
আলো ৩০ মে, ২০০৬)। আমরা আনন্দিত যে, তার মতো চিন্তাশীল ব্যক্তি এ সম্পর্কে গভীরভাবে
ভাবছেন এবং কলম ধরেছেন। কারণ আমরা 'সুজনে'র উদ্যোগে বছর দুই আগে এ ব্যাপারে কতগুলো
সুস্পষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করেছি এবং জনমত সৃষ্টির প্রচেষশ্টা চালিয়ে আসছি। তার মতো
রাজনীতিকরা সোচ্চার হচ্ছেন দেখে আমরা আশান্বিত হচ্ছি। তবে কতগুলো ক্ষেত্রে তার
বক্তব্য অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ।
রাজনীতিবিদরা আমাদের বোঝাতে সক্ষম
হয়েছেন যে, নির্বাচন বা ভোটের অধিকারই গণতন্ত্র। তবে নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক
পদ্ধতি মাত্র। নির্বাচন সর্বস্ব গণতন্ত্র 'একদিনের গণতন্ত্র', যব শুধু নির্বাচনের
দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমাদের অভিজ্ঞতায়, একদিনের গণতন্ত্র পাঁচ বছরের
ইজারাতন্ত্রের সূচনা করে। তাই সত্যিকারের গণতন্ত্রের জন্য আরো প্রয়োজন গণতান্ত্রিক
রীতিনীতির চর্চা এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।
একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সুষ্ঠু ও
নিরপেক্ষ নির্বাচন অপরিহার্য। জনাব মুহিত যথার্থই বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য
প্রয়োজন প্রশ্নাতীতভাবে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তবে আমরা মনে করি,
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আমাদের রাজনৈতিক দুর্বত্তায়নের সমস্যার স্থায়ী সমাধান
নয়। বরং সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার কিংবা ধামাচাপা দওয়ার্ই পন্থা। এছাড়া অনির্বাচিত
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আমাদের সংবিধানের 'প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র' (অনুচ্ছেদ-১১)-
এ মৌলিক কাঠামোরও পরিপন্থি। তদুপরি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একটি অবিশ্বাসের 'বিষফল'-
রাজনৈতিক দলের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস এবং তাদির প্রতি জনগণের অবিশ্বাস, যা
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে অসম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আমরা আগামী দুই-তিন
মেয়াদের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির পক্ষে। গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে তখনই যখন নির্বাচিত দলীয় সরকার নির্বাচনকালীন
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ঁিত্ব পালন করতে সক্ষম হবে।
প্রসঙ্গত, আমাদের রাস্ট্রপতি পরম পরাক্রমশালী হয়ে
ওঠেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তাই অযোগ্য ও কট্টর দলীয় ব্যক্তি যাতে রাষ্ট্রপতি
নির্বাচিত নআ হতে পারেন সেদিকে দৃষ্টি দেয়াও জরুরি। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি
নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ইলেকটোরাল কলেজ
বা নির্বাচকমণ্ডলী সৃষ্টি করা যেতে পারে।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সির্বাচন কমিশনের সৃষ্টি। তাই নির্বাচন কমিশনকে
স্বাধীন ও শক্তিশালী করার এবং দল নিরপেক্ষ ও স্বধীনচেতা ব্যক্তিদের কমিশনে মনোনয়ন
দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন কমিশন যথাযথভাবে কাজ করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার
ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাই ফুরিয়ে যাবে।
তবে সর্বাধিক নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সবচেয়ে
শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, যদি
রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা সদাচারণ না করেন। রাজনীতিবিদরা যদি
গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে না চলেন এবং ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নির্বাচনে জেতার জন্য
বদ্ধপরিকর হন তাহলে কারও পক্ষেই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব হবে
না। তাই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দলের সংস্কার আজ অপরিহার্য।
জনাব মুহিত বলেছেন, রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র ও আথির্ক
সচ্ছতা নিশ্চত করতে হবে। তাদের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় উড়ে এসে জুড়ে বসার সংস্কৃতির
অবসান ঘটাতে এবং মনোনয়ন প্রদানে দলের প্রাথমিক সদস্যদের ভূমিকা নিশ্চইত করতে হবে।
কিন্তু কে করবে? রাজনীতিবিদরা সেচ্ছায় এগুলো করবেন না। কারণ এসব পরিবর্তন তাদের
স্বার্থের পরিপন্থি। দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তারা পরিবারতন্ত্র কায়েম করতে
পারবেন না। মনোনয়নপত্রকে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক করলে তাদের কর্তৃত্ব খর্ব হবে এবং
অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন বিক্রি করার সুযোগ বিনষ্ট হবে। এছাড়া স্থানীয় সরকারকে
শক্তিশালীকরণ, বিচারবিভাগের পৃথকীকরণ এবং নিজেদের সম্পদের হিসাব প্রদানসহ তারা অতীতে
বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন, যা তারা পালন করেন নি।
রাজনৈতিক দলের সংস্কার নিশ্চিত করতে হলে তাদের
নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা দরকার। প্রায় সব কার্যক্রম
পরিচালনার জন্যই কোনো না কোনো কর্তৃপক্ষের অধীনে নিবন্ধন নিতে হয়। শিক্ষকতা, ওকালতি,
সমাজকর্ম, এমনকি রিক্সাচালকের জন্যও ছাড়পত্রের প্রয়েজন হয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলের
জন্য কোনো নিবন্ধনের প্রয়োজন পড়ে না। প্রতিবেশী ভারতসহ অনেক দেশেই দায়বদ্ধতা
নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দলের অভ্যন্তরে
গণতন্ত্র চর্চা, মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ও দলের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ হওয়া
উচিত নিবন্ধনের শর্ত। দুর্ভাগ্যবশত জনাব মুহিত রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক বিষয়ে
সম্পূর্ণ নীরব।
রাজনৈতিক দলের সংস্কারের অংশ হিসেবে আমরা এদের অঙ্গ
সংগঠনের, বিশেষত ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনের বিলুপ্তির প্রস্তাব করছি। ছাত্র ও শ্রমিক
সংগঠনগুলো আজ মূলত দলবাজি, ফায়দাবাজি তথা সব অপকর্মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
রেজুড়বৃত্তির রাজনীতির মাধ্যমে ছাত্র সংগঠনগুলো আজ আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে
প্রায় ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। ছাত্রদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে ছাত্ররাজনীতির
আমরা বিপক্ষে নই, কিন্তু লাঠিয়ালগিরির রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া আবশ্যক।
জনাব মুহিতের সঙ্গে আমরা একমত যে, গণতন্ত্রকে অর্থবহ
করতে হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের বিস্তারিত তথ্য
প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের মতে, প্রার্থীদের
সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার তাদের সংবিধানস্বীকৃত বাকস্বধীনতা বা
মতপ্রকাশের অধিকারের অন্তর্ভুক্ত, কারণ ভোটাররা তাদের মত প্রকাশ করেন ভোটের মাধ্যমে।
গত বছর মে মাসে বাংলাদেশ হাইকোর্টও ভোটারদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকারের স্বীকৃতি
প্রদান করে একটি ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের মনোনয়নবঞ্চিত
করতে রাজনৈতিক দলগুলো তথ্য প্রদানের এ বাধ্যবাধকতাকে কাজে লাগাতে পারে।
দুর্ভাগ্যবশত সম্প্রতি এ রায়ের বিরুদ্ধে গোপনে এক অজ্ঞাত তৃতীয় পক্ষ সুপ্রীম কোর্টে
একটি আপীল দায়ের করেছে এবং মূল মামলার বাদী ও উকিলদের অনুপস্থিতিতে শুনানীও
অনুষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের তথ্য প্রাপ্তির মৌলিক অধিকার খর্ব করার স্বার্থন্বেষীদের
অপচেষ্টার বিরুদ্ধে জনাব মুহিতের মতো রাজনীতিবিদের সোচ্চার হওয়া আজ অতি জরুরি।
জনাব মুহিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সম্পর্কেও কিছু
বলেন নি। এ অনুচ্ছেদ মন্ত্রী পরিষদকে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করার পরিবর্তে সংসদ
সদস্যদেরই দলীয় হাই কমাণ্ডের কাছে জিম্মি করে ফেলেছে।
জনাব মুহিতের মতো আমরাও সাতদিন ব্যাপী নির্বাচন
অনুষ্ঠানের পক্ষে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষেই নিরাপত্তা প্রদান করা
সম্ভব হবে এবং নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে ব্যবহারের আর প্রয়োজন পড়বে না। সেনাবাহিনীকে
বিতর্কের উদ্র্ধে রাখা আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনীতিকে কালোটাকা ও পেশীশক্তির মালিক তথা
দুর্বত্তদের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আবশ্যক। 'না-ভোটে'র
বিধান হতে পারে এমনি একটি সংস্কার। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বত্তদের মনোনয়ন
প্রদান করলেও ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাখান করতে পারবেন। নির্বাচনে
প্রতীকের দৌরাত্ম খর্ব করে প্রার্থীর যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দেয়ার লক্ষ্যে
ব্যালটে প্রতীকের পরিবর্তে প্রার্থীর ছবিও ছাপা যেতে পারে। এছাড়া ভোট একটি পবিত্র
আমানত এবং আমানত খেয়ানত করলে নির্বাচিতদের প্রত্যাহার করার আইনি বিধান করাও আজ
প্রয়োজন।
প্রসঙ্গত, আদালতের রায়ের কপি হাতে না পাওয়ারা অজুহাতে
ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার উদ্যোগ না নেওয়ায় নির্বাচন কমিশনের অনেকেই সমালোচনা
করছেন। আমরা মনে করি, বর্তমান কমিশন এ কাজে হাত দেয়ায় নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। জনগণের
আস্থা আর তাদের উপর নেই । তাই তাদের জন্য উত্তম কাজ হবে অনতিবিলম্বে পদতাগ করাৱ,
যাতে সমঝোতার ভিত্তিতে যথাযথ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত রতুন কমিশন ভেটার তালিকার কাজটি
দ্রুততার সঙ্গে শুরু করতে পারে । |