27 April 2006

সুজনের সংস্কার ও সত্‍ যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন নিয়ে বিভ্রান্তি
-মোজাফ্ফর আহমদ
(২৭ এপ্রিল ২০০৬ দৈনিক প্রথম আলো'য় প্রকাশিত)
 

'সুজন' নামকরণ হয়েছে বছর দুয়েক আগে, 'সিটিজেনস ফর ফেয়ার ইলেকশনস' নামে কাজ শুরু হয় তারও বছর দুই আগে ৷ এ সূচনার আগেও আরেকটি আরম্ভ ছিলো ৷ বর্তমান লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশনের পরিচালকের দায়িত্ব থেকে ছুটিতে যখন বস্টন ইউনিভার্সিটিতে অতিথি অধ্যাপক হিসাবে কাজ করছিলেন তখন উন্নয়নশীল দেশে গণতান্ত্রিক, দায়বদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠান গঠনের বিষয়ে নানা স্থানে আলোচনায় অংশ নেন ৷ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সরকারিখাতের সম্প্রসারণ হয়েছিলো অনেক ৷ বিশ্বব্যাংকসহ নানাদিক থেকে সরকারি খাতের দক্ষতা এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে ৷ বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্টের প্রথম রিপোর্টে বেসরকারিকরণের যে প্রস্তাব ছিলো সেটা ড. রামগোপাল ঢাকাতে প্রথম উপস্থাপন করেন ৷ সেই সময়ই রেহমান সোবহান ও আমার লেখা 'পাবলিক এন্টারপ্রাইজ ইন এন ইন্টারমিডিয়েট রেজিম' নামের বইটি বের হয় ৷ পরবর্তীতে সরকারিখাতের দক্ষতা বৃদ্ধি ও দায়বদ্ধতা নিয়ে এবং বেসরকারিখাতের মুনাফার সন্ধানে সত্যিকার প্রতিযোগিতাহীন বাজারে দায়িত্বহীনতা নিয়ে আমার কিছু লেখা বের হয় ৷ এরই ধারাবাহিকতায় সরকারকে দায়বদ্ধ করতে কিভাবে নাগরিক সমাজ কাজ করতে পারে সে নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে প্রস্তাবনা ও বিবেচনার সাথে আমি যুক্ত থেকেছি ৷ তখন কমিউনিটি পার্টিসিপেশন ও কমিউনিটি রেসপনসিবিলিটি নিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ফ্যামিলি প্লানিং নিয়ে দেশ বিদেশের নানা গবেষণা সংস্থার সাথে কাজ করে একটি উপলব্ধি জন্মে যে, সুশাসন ও দায়বদ্ধতা কেবল সরবরাহের বিষয় নয়, এটা দাবী বা চাহিদার ব্যাপারও বটে ৷ অর্থাত্‍ নাগরিক সচেতনতা না থাকলে সুশাসন গণতন্ত্রেও টিকে থাকে না ৷ আমি সেইসময় বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারে সুশাসন সম্পর্কিত কাজ শুরু করি ৷ নব্বইয়ের শুরুতে ১৭টি জেলাশহরের ৬৫টি ওয়ার্ডে ভোটারদের তথ্যভিত্তিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে যোগ্যপ্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করি ৷ পরবর্তীতে ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ তাদের সচেতন নাগরিক কমিটির মাধ্যমে সরকারি সেবা সম্পর্কে আমার প্রচেষ্টায় রিপোর্ট কার্ড সম্পর্কিত সমীক্ষা কার্যক্রম শুরু করে ৷ এখানে ব্যাঙ্গালোরের পাবলিক এফেয়ার্স কমিটি প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা প্রদান করে ৷

দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ তখন ইউনিয়ন পরিষদে দায়বদ্ধতা সৃষ্টির জন্য উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণার ব্যবস্থাসহ তাদের প্রশিক্ষিত উজ্জীবক, চেয়ারম্যানদের সহায়তায় গ্রামগঞ্জে নাগরিক অধিকারের চেতনা সৃষ্টিতে নানা কার্যক্রম হাতে নেয় ৷ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এসে গেলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কিছু সচেতন নাগরিক ২০০২ সালের নভেম্বরে একত্রিত হয়ে ‌‌'সিটিজেনস ফর ফেয়ার ইলেকশনস' নামে একটি প্লাটফর্ম তৈরি করে ৷ এখানে সিদ্ধান্ত হয় দাতাদের টাকায়, আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি বদলাবার প্রচেষ্টা, একদিনের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে অর্থবহ হয় না ৷ সুতরাং সৎ‍, যোগ্য, দক্ষ, দায়বদ্ধ প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে ৷ যেখানে সম্ভব এবং যতগুলো ইউনিয়নে সম্ভব স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা এ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন ৷ এর ফলে- ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সত্‍ যোগ্য প্রার্থী যাতে নির্বাচিত হয় সেজন্য প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে ভোটারদের জানিয়ে দেয়া এবং অনেকক্ষেত্রেই প্রার্থীদের ভোটারদের মুখোমুখি করা হয় ৷ প্রায় পঞ্চাশাধিক ইউনিয়নে এ কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে ৷ একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে এজাতীয় আয়োজন যেখানেই করা হয়েছে সেখানেই নির্বাচনী ব্যয় কম হয়েছে, সহিংসতা কমেছে এবং নির্বাচন পরর্বতীকালে সহযোগিতা বজায় থেকেছে ৷

পরবর্তীকালে পৌরসভা নির্বাচনের সময় ২৫টি পৌরসভায় একই রকম কাজ করেছে এই সংগঠন ৷ নির্বাচনোত্তর সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে তথ্যভিত্তিক ক্ষমতায়ন প্রার্থী নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করে থাকে, যদিও এর পরিমাণ সঠিকভাবে নিরূপন করা মুশকিল ৷ এমন অবস্থায় বিভিন্ন অঞ্চলের সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগে সিটিজেনস ফর ফেয়ার ইলেকশনের নতুন নামকরণ করা হয় 'সুজন' ৷ এপর্যন্ত ৬০টি জেলায়, ৩৯টি উপজেলায় এবং ৩৫টি ইউনিয়নে সুজনের কমিটি গঠিত হয়েছে ৷ 'সুজন' সাংবিধানিক প্রত্যয়কে বাস্তবায়িত করতে চায়, মানুষের অধিকার মানুষের কাছে স্পষ্ট করে তুলতে চায় ৷ গণপ্রজাতন্ত্র সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত দেখতে চায় ৷ প্রশাসনের প্রতি স্তরে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়বদ্ধ শাসনের প্রচলন দেখতে চায় ৷ বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণের কাছে সরকারকে নিয়ে যেতে চায় ৷ স্থানীয় সরকারে সর্বক্ষণ জবাবদিহিতার মাঝে কর্মচঞ্চল রাখতে চায় ৷ সেখানে আমলাতন্ত্র ও এমপিতন্ত্রের অবসান করে সচেতন নাগরিকের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায় ৷ এ সময় 'সুজন'যে পোস্টার বের করে তাতে লেখা ছিলো:

"কালো টাকা অস্ত্রসস্ত্র যে করে বর্জন/
নিজভোটে সত্‍ লোক যোগ্য লোক করি নির্বাচন/
গঠন করি দায়বদ্ধ পৌর সুশাসন" ৷
এথেকে বোঝা যায় সত্‍ ও যোগ্য লোক নির্বাচনের জন্য জনসচেনতা সৃষ্টিতে সুজন বেশ আগে থেকেই কাজ করছে ৷

এরই ধারাবাহিকতায় আমরা জাতীয় সংসদ উপনির্বাচনে নেমে পড়ি ৷ টঙ্গীর নির্বাচনে একটি দলের প্রার্থীর অসম্মতি থাকায় সেখানে আমাদের উদ্যোগ সফল হয় নি ৷ সুনামগঞ্জে জনসমর্থন ও হাইকোর্টের তথ্যায়ন সম্পর্কিত রায় থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের ও স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতায় আমাদের উদ্যোগ সফল হয় নি ৷ এ নিয়ে আমরা আবার রিট করেছি হাইকোর্টে ৷ বিচারের বানী সেখানেও নীরবে কাঁদছে ৷ ফরিদপুরেদিনাজপুরে আমরা তথ্যবিত্তিক ক্ষমতায়ন ও প্রার্থীদের মুখোমুখি অনুষ্ঠান করেছি এবং জনগণ এটা অভিনন্দিত করেছে ৷ মানিকগঞ্জে হতে হতেও একজন প্রার্থীর অসহযোগিতার কারণে এটা সম্ভব হয় নি, যদিও রিটার্নিং অফিসার প্রার্থীদের দেয়া তথ্য দিয়ে পোস্টার ছেপে বিলি করেছেন ৷ তথ্যের সত্যাসত্য বিচার হয় নি ৷ জনগণ তথ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করতে সুযোগ পায়নি ৷ আশাকরি ২৬ এপ্রিল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে আমাদের প্রচেষ্টা সফল হবে ৷ আমাদের নির্ধারিত ছকে প্রধান প্রার্থীরা তথ্য দিয়েছেন ৷ এটা অত্যন্ত উত্‍সাহব্যঞ্জক ৷

অন্যদিকে সুজন নির্বাচন কমিশনের সংস্কার, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার, রাজনৈতিক দলের সংস্কার ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সংস্কার নিয়ে দাবী তুলতে থাকে ৷ একপর্যায়ে ডেইলি স্টারের সাথে করা ২৫ সেপ্টেম্বর গোলটেবিল বৈঠকের বিবরণ ১৪ জানুয়ারি, ২০০৫ তারিখের কাগজে প্রকাশিত হয় ৷ পরবর্তীতে ১০ই এপ্রিল, ২০০৫ প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সহযোগিতায় সুজন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংস্কার, নির্বাচন কমিশন সংস্কার, রাজনৈতিক দলের সংস্কার ও জনসাধারনের প্রার্থী সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকার নিয়ে সুজন একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে ৷ এরপর থেকে সুজন নিরবচ্ছিন্নভাবে ঢাকায় ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসমস্ত সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে ৷ সুজনের সদস্যরা নির্ভুল ভোটার তালিকা, তথ্য জানার অধিকার, নির্বাচন বিধির পরিবর্তন নিয়ে দেশের ইউনিয়নে, উপজেলায়, জেলায় কাজ করে যাচ্ছে স্বেচ্ছাশ্রমে, বিদেশী দাতাদের কাছ থেকে কোনো টাকা না নিয়ে ৷

সুজন কোনো রাজনৈতিক দল নয় ৷ অধ্যাপক ইউনূসের সত্‍ যোগ্য লোকের দল গঠনের প্রস্তাবের সাথে আমাদের কাজকর্মের মিল নেই ৷ এমনকি সিপিডি-র নেতৃত্বে যে ভিশন স্টেটমেন্ট তৈরির এলিট প্রচেষ্টা তা থেকেও আমরা দূরে আছি ৷ আমরা মাঠের মানুষের গণতান্ত্রিক ক্ষমতার উদ্বোধন ঘটাতে চাই ৷ আমাদের আয়োজিত সাম্প্রতিক মানববন্ধন উপলক্ষে জনাব জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী সুজন ও অধ্যাপক ইউনূসের ডাককে যে একত্র করে দেখেছেন, সেখানেও আমরা অস্বচ্ছ অবস্থা লক্ষ্য করে আমাদের দীর্ঘকালের কার্যক্রমের কথা বলে ভ্রান্তি নিরসনের চেষ্টা করলাম ৷ আশাকরি ভিন্ন ধারায় সমান্তরাল কার্যক্রম জনমানুষকে গণতান্ত্রিক অধিকারের যোগ্য ব্যবহারে আমরা সফল হব ৷
মোজাফ্ফর আহমদ
: অর্থনীতিবিদ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর ট্রাস্টি
 

http://www.prothom-alo.net/v1/newhtmlnews1/category.php?CategoryID=4&Date=2006-04-27


Home  / Feedback  / Subscribe

For technical information contact: webmaster
This site is developed and maintained by The Hunger Project-Bangladesh