ফরিদপুর-১ উপনির্বাচন
বিএনপি ছাড়ছেন শাহ জাফর

প্রণব সাহা ও রাসেল আহমেদ বোয়ালমারী থেকে; আরিফুর রহমান, ঢাকা
প্রার্থীদের সম্পত্তির হিসাব ভোটাররা বিশ্বাস করেন না
ফরিদপুর-১ আসনের উপনির্বাচনে ভালোভাবেই মাঠে থাকছেন শাহ মোঃ আবু জাফর। উপনির্বাচন করা চলবে না− কেন্দ্রীয় ও জেলা বিএনপি নেতাদের উপর্যুপরি এ রকম সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দল ছাড়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
আজ বুধবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে শাহ জাফর বিএনপি থেকে পদত্যাগের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে। ফরিদপুর-১ আসনের আওতাধীন আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী থানা বিএনপির উল্লেখযোগ্য অংশও শাহ জাফরের সঙ্গে বিএনপি ছাড়বেন বলে জানা যায়।
এ ব্যাপারে বোয়ালমারী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হাশেম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শাহ জাফর বিএনপি ছাড়ছেন বাধ্য হয়েই। আমরাও তাকে অনুসরণ করছি।
যোগাযোগ করা হলে শাহ মোঃ আবু জাফর প্রথম আলোকে বলেন, অনন্যোপায় হয়ে আমাকে বিএনপি ছাড়তে হচ্ছে। আমি উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি। দল থেকে বলা হচ্ছে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য। কিন্তু আমার হাজার হাজার কর্মী, শুধানুধ্যায়ীর সাফ কথা, নির্বাচন করতেই হবে। নির্বাচনী ময়দানে আছি, জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে কে বিজয়ী হবে।
শাহ জাফর দল ছাড়ছেন− এমন খবর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারিছ চৌধুরীর জানা নেই। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব।
বোয়ালমারীতে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, বিএনপি প্রার্থী কাজী সিরাজুল ইসলাম যেমন তথ্য গোপন করেছেন, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শাহ আবু জাফর ও ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী মুফতি শরাফত হোসেনের দেওয়া সম্পদের হিসাবও এলাকার ভোটাররা বিশ্বাস করেন না। গতকাল মঙ্গলবার ফরিদপুর-১ আসনের নির্বাচনী এলাকার বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গায় ঘুরে জানা গেছে, পেশাদার রাজনীতিক হলেও পৈতৃক সূত্রে পাওয়া শাহ জাফরের বিস্তর বিষয়-সম্পত্তি আছে; যার সবটাই মনোনয়নপত্রে দেওয়া হলফনামায় (এফিডেভিট) উল্লেখ করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শাহ আবু জাফর তার হলফনামায় যে সম্পত্তির হিসাব দিয়েছেন তাতে তিনি ৫০ লাখ টাকা দামের তিনতলা একটি বাড়ি, একটি বাণিজ্যিক ভবন ও ঢাকার উত্তরায় ৫ কাঠা আয়তনের একটি সরকারি প্লটের কথা উল্লেখ করেছেন। এর বাইরে ৫০ বিঘা কৃষিজমির কথা উল্লেখ করেছেন, যার দাম ধরা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। শাহ জাফর তার জিপের মূল্য ১ লাখ টাকা এবং আসবাবপত্রসহ নগদ ১ লাখ টাকার কথাও হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
আর মুফতি শরাফত হোসেন ১৫ লাখ টাকা মূল্যের সাড়ে চার একর জমি আছে বলে জানিয়েছেন। আড়াই লাখ টাকা দামের তিনটি টিনের ঘরের সঙ্গে ৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কারের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।
গতকাল শাহ জাফরের নিজ উপজেলা বোয়ালমারীতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার পৈতৃক নিবাস হাসামদিয়া গ্রামেই আছে দোতলা টিনের ঘরসহ বড় বাড়ি। বাগান, পুকুর, কাচারিঘর ও মসজিদ মিলিয়ে এখানে জমির পরিমাণ হবে প্রায় ৫ একর। এই সম্পত্তির মালিক তারই দুই ভাই। বোয়ালমারীতে ময়েনদিয়া বাজারে শাহ জাফরের তিনতলা বাণিজ্যিক ভবন আছে, সেখানে সোনালী ব্যাংক ও গ্রামীণফোনের টাওয়ার বসানো হয়েছে। বোয়ালমারী কলেজ রোডে দোতলা বাড়িতে ভাড়া দেওয়া হয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে। ফরিদপুর শহরের আলীপুরের কবি জসীমউদ্দীন রোডে শাহ জাফরের একটি একতলা ভবন আছে, যা জেলা পরিষদ থেকে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধক নেওয়া হয়েছে।
ঢাকায় মোহাম্মদপুরেও শাহ জাফরের নিজস্ব বাড়ি আছে, যেখানে তিনি নিজে বসবাস করেন। এ ছাড়া উত্তরার পাঁচ কাঠার সরকারি জমির কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। জানা গেছে, শাহ জাফরের ছেলে লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়েন। পৃথক একটি সূত্রে জানা গেছে, শাহ জাফরের স্ত্রী মর্জিনা বেগমের পারিবারিক সূত্রে মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসের অংশীদারত্ব আছে। কিন্তু মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামায় প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের দায়দেনার বিবরণীতে স্ত্রীর এই সম্পদের কোনো উল্লেখ নেই। হলফনামায় শাহ জাফর নিজের পেশা হিসেবে রাজনীতি এবং আরেক উৎস হিসেবে কৃষি ও ঘরভাড়া উল্লেখ করেছেন।
টেলিফোনে শাহ জাফরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ১০৫ বিঘা জমি থাকলেও রাজনীতি করতে গিয়ে সব বিক্রি করেছি। উত্তরার জমি বরাদ্দ হলেও দলিল হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে শাহ জাফর বলেন, কেউ আমার ওপর নির্ভরশীল নয়, আমার কোনো পোষ্য নেই। তাই স্ত্রীর যেসব সম্পত্তি আছে তা উল্লেখ করা হয়নি। বিদেশে ছেলের পড়াশোনার খরচও স্ত্রী দেন বলে উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুরের বাড়িটি তার স্ত্রী ও স্ত্রীর ভাইয়ের নামে।
ঢাকায় যাওয়ার কারণ সম্পর্কে শাহ জাফর বলেন, নির্বাচনের পোস্টার ও গলার চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছি। বিএনপি মহাসচিব জনাব মান্নান ভুঁইয়া ডেকে পাঠিয়েছেন কি না− জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফরিদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাদা সাহেব জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী দেখা করতে বলেছেন। আমি জানিয়ে দিয়েছি যে, এখন নির্বাচনের সময়, ব্যস্ততা আছে− দেখা করা যাবে না।’
ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী মুফতি শরাফত হোসেন তার পেশা হিসেবে ব্যবসা বলে হলফনামায় উল্লেখ করলেও কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেননি। গত শনিবার তিনি একটি জিপগাড়ি নিয়ে এসে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। কিন্তু হলফনামায় তার ব্যক্তিগত গাড়ির কোনো উল্লেখ নেই। গতকাল এ ব্যাপারে শরাফত হোসেনের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি পাটের ব্যবসা করি। সেই ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স ও টিন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) আছে, দরকার হলে দিতে পারি।’ গাড়ি সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি ইসলামী ঐক্যজোটের গাড়ি ব্যবহার করি না। সেদিনের ব্যবহৃত গাড়িটি ভাড়া বা আমার কোনো বন্ধুর গাড়ি হতে পারে।
গতকাল বোয়ালমারী উপজেলায় শাহ জাফরের নিজ গ্রাম হাসামদিয়ায় ঘুরে এলাকাবাসী ও তার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলে তার সহায়-সম্পত্তির একটি আনুমানিক হিসাব পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, পেশাদার রাজনীতিক হওয়ায় শাহ জাফরের কোনো সহায়-সম্পদের হাঁক-ডাক নেই। তার কোনো দেমাগ নেই। বোয়ালমারী গিয়ে অবশ্য শাহ জাফরকে পাওয়া যায়নি। তিনি সোমবার রাতেই ঢাকায় চলে গেছেন। মোবাইল ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।