সুনামগঞ্জ উপনির্বাচন : আদালতের নির্দেশে প্রার্থীর ৮ তথ্য
রয়েছে নানা অসঙ্গতি, অসত্য তথ্য

 উজ্জ্বল মেহেদী, সুনামগঞ্জ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানা ও সেগুলো যাচাই-বাছাই করে পছন্দমতো ভোট দেওয়ার যে সুযোগ দেশবাসীর সামনে প্রথমবারের মতো এসেছে, তা প্রহসনে পরিণত হতে চলেছে। হাইকোর্টের নির্দেশে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের আসন্ন উপনির্বাচনের প্রার্থীরা নিজেদের সম্পর্কে যেসব তথ্য নির্বাচন কমিশনে দাখিল করেছেন, অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তাতে প্রচুর অসঙ্গতি, বিভ্রান্তি ও অপূর্ণতা তো রয়েছেই, এমনকি পাওয়া গেছে অসত্য তথ্যও।
আর এসব তথ্যই সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তর গত ৩ জুলাই গণবিজ্ঞপ্তি আকারে জারি করে জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রার্থীদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানার সুযোগ ভোটারদের থাকল কোথায়?
শুধু তাই নয়, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী প্রার্থীরা তাদের তথ্য দাখিল করেছেন হলফনামার মাধ্যমে। হলফনামা করে কেউ যদি অসত্য তথ্য দাখিল করেন, তাহলে কী হবে অথবা দাখিল করা অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ব্যাপারেই বা কী হবে− সেসব প্রশ্নও বড় হয়ে উঠেছে।
গত ২৪ মে একটি জনস্বার্থ রিট মামলার রায়ে হাইকোর্ট সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের আট ধরনের তথ্য নিতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেন। ভুল বা অসঙ্গত তথ্য দেওয়ার শাস্তির কথা এ রায়ে নেই। কিছুদিন আগে নির্বাচন কমিশনের এক বৈঠকে বিষয়টি উঠলেও সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। তবে সুনামগঞ্জের রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক মোঃ জাফর সিদ্দিক বলেছেন, এফিডেভিট করে মিথ্যা তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে সে অপরাধে দায়ী করা যেতেই পারে।
হাইকোর্ট যে আটটি বিষয় নির্বাচন কমিশনকে জানাতে বলেছে সেগুলো হচ্ছে− প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রার্থী কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কি না, অতীতে ফৌজদারি মামলা হয়েছিল কি না− হয়ে থাকলে ফলাফল কী, পেশা/জীবিকা, আয়ের উৎস/উৎসসমূহ, অতীতে সংসদ সদস্য ছিলেন কি না, প্রার্থী ও প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি/ব্যক্তিদের সম্পদ ও দায়দেনার বিবরণী এবং ঋণ সংক্রান্ত বিবরণী।
সুনামগঞ্জ উপনির্বাচনের ৯ প্রার্থীর সবাই শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘর পূরণ করলেও কারোর তথ্যই পূর্ণাঙ্গ নয়। কৃষক মোঃ সাদেক এ ঘরে লিখেছেন না, মোঃ আতাউর রহমান লিখেছেন প্রযোজ্য নয়। প্রার্থী ও তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি/ব্যক্তিদের সম্পদ ও দায়দেনার বিবরণী ও ঋণ সংক্রান্ত বিবরণীর দুটো ভাগ রয়েছে− সম্পদ ও দায়দেনাসমূহ। সব প্রার্থীই কয়েক শব্দে সম্পদের বিবরণ শেষ করেছেন, কিন্তু দায়দেনার ঘরটি সবাই ফাঁকা রেখে দিয়েছেন।
৯ জনের মধ্যে ৮ প্রার্থীই ঋণসংক্রান্ত বিবরণীর চারটি ঘরের একটিও পূরণ করেননি, অর্থাৎ ঋণ নিয়েছেন নাকি নেননি এর কোনোটাই তারা জানাননি।
বর্তমানে কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কি না এবং অতীতে ফৌজদারি মামলা হয়েছিল কি না− হয়ে থাকলে ফলাফল কী− এ দুই প্রশ্নের জবাবে একজন বাদে সবাই না লিখেছেন। শুধু যুবলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য নাগরিক কমিটির প্রার্থী নজরুল ইসলাম বলেছেন, তিনি একটি মামলার আসামি ছিলেন− পরে সরকার তা প্রত্যাহার করে নেয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জোট প্রার্থী শাহীনূর পাশা চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণার লিফলেটে বলা হয়, তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সুনামগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক এবং মাসিক তৌহিদী পরিক্রমা নামক একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক, হজরত শাহজালাল (রহঃ) ইসলামী একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল, রাগিব-রাবেয়া ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যাপক, জগন্নাথপুর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জ কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। অথচ নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া বিবরণীতে তিনি পেশা/জীবিকার ঘরে শুধু আইন ব্যবসার কথা উল্লেখ করেন।
শাহীনূর পাশার আইন পেশার ব্যাপারটি নিয়েও আইনজীবী মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ বারের কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, শাহীনূর পাশা কোনোদিন ওকালতনামায় সই করেছেন কি না সন্দেহ। তারা বলেন, ওকালতনামায় সই না দিয়েও তিনি আইনি পরামর্শ দিতে পারেন এবং শুধু এ জন্য তিনি আইন ব্যবসায়ী পরিচয় দিতেও পারেন। তবে অন্যান্য পেশার কথা চেপে যাওয়াটা অনৈতিক হয়েছে।
শাহীনূর পাশা সম্পদ ও দায়দেনার বিবরণীতে স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে ৫ লাখ টাকার ফসলি জমি এবং অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে স্ত্রীর অলঙ্কারসহ আসবাবপত্র ইত্যাদির মূল্য ৩ লাখ টাকা দেখিয়েছেন। পারিবারিক সূত্রমতে, শাহীনূর পাশা তার ব্যবহারের পাজেরো জিপ, সিলেটের সুবিদবাজারে ৫১/১৩, চৌধুরী ভবন নূরানী' বাসার কথা বেমালুম চেপে গেছেন। সিলেটে তার আবাসিক হোটেল ব্যবসা ছাড়াও তার আয়ের বেশকিছু উৎস রয়েছে। তিনি স্ত্রী-পুত্র নিয়ে প্রায়ই আমেরিকা বেড়াতে যান।
এ ব্যাপারে শাহীনূর পাশা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলার জন্য তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার প্রেসসচিব পরিচয় দিয়ে একজন বলেন, তিনি গণসংযোগে ব্যস্ত আছেন। এ নিয়ে পরে কথা বলেন। এক দিন পর বাসায় ফোন করলে তার স্ত্রী সৈয়দা রোমেনা পাশার সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আমরা আমেরিকা আসা-যাওয়া করি। কোনো নাগরিকত্ব নেই। সেখানে আমার স্বামীর দুই ভাই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। আমাদের সন্তানও সেখানে থেকে লেখাপড়া করে। পাজেরো জিপ ছিল। বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আবাসিক হোটেলটিও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আর সিলেটের বাসা তার ভাইয়ের সম্পত্তি। তিনি দাবি করেন, তার স্বামী নির্বাচন কমিশনে যে তথ্য দিয়েছেন তা সঠিক। কোনো কিছু গোপন করা হয়নি।
নাগরিক কমিটির প্রার্থী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে− তিনি লন্ডনে এবং বাংলাদেশে কোটি টাকার ট্রাভেলস ব্যবসা, আবাসিক হোটেল ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিররণ গোপন করেছেন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সূত্রমতে, নজরুল ইসলাম তার শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে শুধু এইচএসসি লিখেছেন, উত্তীর্ণ না অনুত্তীর্ণ তা উল্লেখ করেননি। জানা যায়, নজরুল ইসলাম কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার সনদ এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনার প্রমাণ দাখিল করেছেন।
প্রথম আলোকে নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি এইচএসসি পাসের সব কাগজপত্রও জমা দিয়েছেন। সম্পত্তির ব্যাপারে তার বক্তব্য হলো কোটি টাকার সম্পত্তি থাকলেও আমরা পাঁচ ভাই এবং এক বোনের যৌথ পরিবার। তাই তথ্যে শুধু আমার অংশ দিয়েছি।
স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে লিখেছেন প্রযোজ্য নয়। এ ব্যাপারে তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখযোগ্য নয় বলে প্রযোজ্য নয় লিখেছি।
প্রায় সব জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিশেষ পরিচিতি পাওয়া মোঃ সাদেক নামের আগে কৃষক লিখলেও সুনামগঞ্জ উপনির্বাচনে তিনি জীবিকা ও আয়ের উৎসের ঘরে লিখেছেন ব্যবসা।
উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ জাফর সিদ্দিক প্রার্থীদের তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, প্রার্থীর দেওয়া সব তথ্য যথাসম্ভব যাচাই করে প্রকাশ করা হয়েছে। যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি হয়নি। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সুনামগঞ্জ সদর ইউএনও মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রার্থীর দেওয়া তথ্যের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করব। তদন্তে প্রমাণিত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে যাচাই-বাছাইয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থা। হাঙ্গার প্রজেক্টের কান্ট্রি ডিরেক্টর ও সুজন−সুশাসনের জন্য নাগরিকের সদস্য সচিব ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের এখন থেকে আটটি তথ্য দিতে হবে। সুনামগঞ্জ-৩ আসনের উপনির্বাচন থেকে এটি কার্যকর হচ্ছে। শুরুটা কী রকম হচ্ছে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেল, গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত তথ্যগুলো কার্যত অসম্পূর্ণ। এসব তথ্য সংকুচিতভাবে গ্রহণ থেকে মনে হয়, নির্বাচন কমিশন দায়সারাভাবে কাজটি করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তথ্যগুলো যথাসম্ভব যাচাই করে নেওয়া হয়েছে। কেউ এফিডেভিট করে মিথ্যা তথ্য দিলে অথবা তথ্য গোপন করে থাকলে এফিডেভিটে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অপরাধে তাকে দায়ী করা যেতে পারে।
আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস সামাদ আজাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া এ আসনে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না। নির্বাচনে চারদলীয় জোট প্রার্থীসহ মোট ৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। আগামী ২০ জুলাই এ আসনে ভোট হবে।