| |
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
ভূমিকা
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ আর দশটি রাজনৈতিক দলের মত একটি নিছক
দেশশাসন অথবা ক্ষমতারোহনের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট রাজনৈতিক দল নয়।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর জমিনে
আল্লাহর আইন কায়েমের মাধ্যমে বিশ্বের উৎপীড়িত ও মজলুমসহ সকল
মানুষের উপর থেকে মানুষের সর্বপ্রকার জুলুম-উৎপীড়ন দূর করে কুরআন ও
সুন্নাহর ভিত্তিতে বিশ্বে একটি পূর্ণাঙ্গ ইনসাফপূর্ণ এবং
ভারসাম্যমূলক সমাজব্যবস্থা কায়েম করা। বাংলাদেশ আমাদের প্রিয়
জন্মভূমি। এদেশের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার পাঁচশত সত্তর বর্গ
কিলোমিটারের আয়তনে ১৩ কোটি মানুষ নিতান্- দারিদ্র, বঞ্চনা,
অভাব-অনটন এবং হতাশার মধ্যে বসবাস করছে। উপনিবেশিক শাসনামলের শোষণ,
সাম্প্রতিক আমলের সরকার সমূহের কুশাসন, দুর্নীতি, নির্যাতন এবং
লুন্ঠন সীমিত সম্পদের জনভারাক্রান্- বাংলাদেশকে ততোধিক দুর্গতির
দিকে নিয়ে গেছে। আজ বাংলাদেশ বিশ্বের একটি অন্যতম পশ্চাদপদ দেশ।
বাংলাদেশকে আজ বিশ্বের এক নম্বর দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ হিসেবেও
চিহ্নিত করা হচ্ছে। দেশটির বিশেষ ভূ-তাত্ত্বিক ও পারিবেশিক
পরিস্থিতি, সাংবার্ষিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরা, সাইক্লোন,
ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন-নিধন, ফসলহানি এদেশের জনগণকে করে তুলেছে আরো অসহায় এবং
পরমুখাপেক্ষী। শুধু তাই নয়-অযোগ্য, অকর্মন্য, স্বার্থপর এবং লোভী
কায়েমী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চিরায়ত ব্যর্থতা এবং কুশাসনের ফলে
বাংলাদেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এমনকি দেশের আভ্যন্-রীণ
প্রশাসনিক ব্যবস্থাও হয়ে পড়েছে বহুলাংশে পরনির্ভর ও পরমুখাপেক্ষী।
বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং আইএমএফ প্রভৃতি সংস্থার কাছে বাংলাদেশের
অর্থনীতি পুরোপুরি জিম্মি। বিদেশী অর্থের মদদপুষ্ট এক শ্রেণীর
এন.জি.ও (ঘ.এ.ঙ)-যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব,
কৃষ্টি-সংস্কৃতিসহ জাতির সম্পূর্ণ অস্-িত্ব তাদের প্রভুদের কাছে
বিকিয়ে দিতে উদ্যত- তারা আজ বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, নগরে-বন্দরে
সর্বত্র ষড়যন্ত্রের জাল বিস্-ার করেছে। এসব এনজিওগুলো সাহায্য
সংস্থা ও মিশনারী সংস্থার ছদ্মাবরণে আজ বাংলাদেশে ‘নব্য ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানী’ রূপে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের
অর্থনীতি-শিক্ষাব্যবস্থা এবং তথ্য প্রবাহকে তারা আজ নিজেদের কব্জায়
নিয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে।
ক্ষুদ্রায়তনের বাংলাদেশ নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিশ্বের দরবারে
তার স্বকীয় সংস্কৃতি, সমৃদ্ধ ভাষা, উজ্জ্বল ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং
সর্বোপরি বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের জন্যে সমৃদ্ধির এক
অপার সম্ভাবনার বাহক হতে পারে। নদী বিধৌত পলল সমৃদ্ধ বিস্-ৃত
সমভূমির দেশ সবুজ শ্যামলিমা মাখা বাংলাদেশ তার বিস্-ীর্ণ উর্বর
মৃত্তিকার জন্যে হতে পরে বিশ্বের অন্যতম কৃষি উন্নত দেশ।
বাংলাদেশের হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ আভ্যন্-রীণ নদ-নদী শত শত বর্গ
কিলোমিটার বিস্-ৃত জলাভূমি, সুদীর্ঘ সমুদ্র উপকূলভাগ এদেশের বিপুল
মৎস্য সম্পদের সম্বাবনার কথাই জানিয়ে দেয়। বাংলাদেশের পাহাড়-বনানী,
বিচিত্র বন্য প্রাণী, উপজাতীয় ঐতিহ্য ও লোক-সংস্কৃতি, অশেষ
সৌন্দর্য্যমণ্ডিত সামুদ্রিক বেলাভূমি আর মনোমুগ্ধকর সবুজ-শ্যামল
দূষণমুক্ত গ্রামীণ নিসর্গ এদেশে একটি সমৃদ্ধতম পর্যটন শিল্পের
বিকাশের দিকে ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের মাটির নীচে রয়েছে বিশ্বের
অন্যতম সমৃদ্ধতম খনিজ গ্যাসের জানা-অজানা এবং আবিষকৃত-অনাবিষকৃত
বিপুল সম্ভার। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে আবিষকৃত হয়েছে বিপুল
পরিমাণের কয়লা, চুনাপাথর, কঠিন শিলা, সাজি-মাটি, ভারী খনিজ
পদার্থসহ আরো অনেক খনিজ সম্পদ। বাংলাদেশের সুন্দরবন-যেখানে রয়েছে
বিশ্বের সবচেয়ে আকর্সণীয় রয়েল-বেঙ্গল-টাইগার এবং বৃহত্তম
ম্যানগ্রোভ বনভূমি। বাংলাদেশে এতসব প্রাকৃতিক সম্পদ সম্ভাবনা থাকার
পরও এদেশ আজ যে অবস্থায় রয়েছে ঠিক তেমনটি থাকার কথা নয়। আল্লাহর
দেয়া অফুরন্- নেয়ামতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা আর দেশের রাজনীতি ও
নীতিনির্ধারকদের সফল ও যথাযথভাবে পরিচালনা ও দিকনির্দেশনা দেয়ার
মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধিশালী এবং শিল্প-বাণিজ্য ও
আধুনিকতার একটি অগ্রগামী মডেল হিসেবে গড়ে তোলা যেত।
অফুরন্- সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের এহেন দারিদ্র,
পশ্চাদপদতা আর হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির মূলে নিহিত রয়েছে এদেশের
প্রচলিত রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ নীতি এবং তার
প্রয়োগ। দেশ ও জাতির এহেন দুর্ভোগ এবং পশ্চাদপদতা থেকে নিষকৃতি
লাভের জন্যে এদেশের অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন তথা
পরিপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও প্রশাসনে যতই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হউক
না কেন- এসবের পরিচালক ও নীতিনির্ধারকদেরকে যদি সৎ ও আদর্শবান করে
গড়ে তোলা না যায় এবং এদেশের মূল রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে যদি একটি
আদর্শিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করা না যায়, তবে কোন উদ্দেশ্যই
বাস্-বায়িত ও ফলপ্রসূ হতে পারবে না। দেশ ও জাতির পরিপূর্ণ স্থায়ী
এবং সার্থক মুক্তির জন্যে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ বাংলাদেশের
রাজনীতিতে আনতে চায় এক নতুন মাত্রা; দান করতে চায় এক ভিন্নতর
আঙ্গিক। যার মূল শ্লোগান হচ্ছে, “আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন
চাই”। কারণ, বিশ্ব জগতের স্রষ্টা ও প্রভূ যিনি আমাদের মালিক, যিনি
পবিত্র কোরআনকে আমাদের পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে প্রেরণ
করেছেন, যিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে মানবতার পথ প্রদর্শক
হিসেবে পাঠিয়েছেন- তাঁর দেয়া জীবন বিধান আল ইসলামই দিতে পারে
বাংলাদেশসহ বিশ্ব মানবের সকল সমস্যার একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধান। এজন্যে
জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে একমাত্র আল-ইসলাম, যা আল্লাহর মনোনীত
একমাত্র জীবন বিধান-ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সমাজে তার বাস্-বায়নেই
বাংলাদেশের সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান। একই সাথে জামায়াতে ইসলামী
আরো বিশ্বাস করে, আল্লাহর বিধান আল-কোরআন ও তাঁর নবীর প্রদর্শিত
নির্ধারিত ও নির্দেশিত পথে পরিচালিত সৎ মানুষরাই প্রকৃত যোগ্য
নেতৃত্ব কায়েমের মাধ্যমে বাংলাদেশে সকল জুলুম-নিপীড়ন,
দুঃশাসন-কুশাসন, দুঃখ-দারিদ্র এবং অত্যাচার-উৎপীড়নের মূল্যেৎপাটন
করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, মানবতাবাদী, শোষণমুক্ত ও প্রগতিশীল সমাজ
প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ দেশের জনগণের
অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের
সংরক্ষণ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের হেফাজত ও শিশু-নারী নির্যাতনের
মূলোচ্ছেদ, সকল পেশা, ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষের কল্যাণ ও মুক্তি
সাধন, দেশের প্রাকৃতিক ও মানবিক পরিবেশের সংরক্ষণ ও উন্নতি সাধন,
সকল গঠনমূলক, কল্যাণধর্মী এবং মানবতাবাদী পদক্ষেপ বাস্-বায়নে
নিবেদিত একটি সংগঠন। দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের রাজনীতিতে
অংশগ্রহণের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এদেশে উপরোল্লেখিত
বিষয়াবলী বাস্-বায়নের জন্যে ‘আল্লাহর আইন ও সৎ লোকের শাসন’
প্রতিষ্ঠার প্রয়াসী যুগপৎভাবে একটি দ্বীনি এবং রাজনৈতিক সামাজিক
সংগঠন। তড়িঘড়ি করে এবং যেনতেনভাবে জামায়াত ক্ষমতা লাভে আগ্রহী নয়।
বরঞ্চ আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও মানবতার মুক্তির জন্যে জামায়াত
স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনায় নিয়মতান্ত্রিক পথে
সংগ্রাম করে চলেছে। বিগত পঞ্চাশ বছরের নিরন্-র, নিরলস, নিঃস্বার্থ
এবং নিয়মতান্ত্রিক তৎপরতার মাধ্যমে জামায়াত বর্তমানে বাংলাদেশে
ইসলামী জাগরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ
তার অগণিত ত্যাগী ও আদর্শবান নেতা-কর্মীর প্রচেষ্টায় এদেশে অসংখ্য
দ্বীনি-প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা, সমাজকল্যাণ সংস্থা, আদর্শ এবং
আধুনিকতার সমন্বয়ে গঠিত স্কুল-কলেজ মাদ্রাসাসহ উচ্চতর
শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদি চালু
এবং ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে-যা নানাভাবে দেশে একটি
ইসলামী তথা প্রাগ্রসর মানবিক মননশীলতা সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরীতে অবদান
রেখে চলেছে। বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতিতেও জামায়াত একটি সুস্পষ্ট
ইসলামিক তথা আদর্শিক ধারা প্রবর্তনে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, আজকে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদ্ধতি চালু হয়েছে
তার রূপকারও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ।
জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির লক্ষ্য হচ্ছে, আল্লাহতা’লা পবিত্র কুরআনে
তাঁর নবীর মাধ্যমে সমাজে যেসব বিষয়ে অনুমোদন ও বাস্-বায়ন করার
নির্দেশ দিয়েছেন-সেসবের বাস্-বায়ন ও অনুমোদন এবং যেসব বিষয়ে নিষেধ
করেছেন-সেসব বিষয় থেকে ব্যক্তি, দেশ ও জাতিকে মুক্ত রাখা। এজন্য
জামায়াতে ইসলামী চায়, আল্লাহ নির্দেশিত ও রাসূল (সঃ) প্রদর্শিত পথে
দেশে ‘আল্লাহর আইন ও সৎ লোকের শাসন’ বাস্-বায়নের মাধ্যমে একটি
দুর্নীতিমুক্ত, জুলুম নিপীড়নশূন্য, দারিদ্র ও ক্ষুধামুক্ত,
সুখী-সমৃদ্ধ এবং স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা কায়েম
করা। উপরোক্ত লক্ষ্য বাস্-বায়নের জন্য জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ
দেশের সকল গণতন্ত্রকামী ও দেশপ্রেমিক শক্তির কল্যাণধর্মী, গণমুখী
এবং গণতান্ত্রিক নীতি ও কর্মতৎপরতাকে সমর্থন করে যাবে এবং দেশ ও
জাতির স্বার্থ বিরোধী কোরআন-হাদীস পরিপন্থী সকল অপতৎপরতাকে
প্রতিরোধ করে যাবে। জামায়াত বিশ্বাস করে জনগণের সহযোগিতা নিয়েই একটি
নির্বাচিত সরকারের পক্ষেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
উপরোল্লেখিত মূলনীতি সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ আগামী
সাধারণ নির্বাচনের এই নির্বাচনী ইশতেহার (মেনিফেস্টো) ঘোষণা করছে-যা
বাস্-বায়নের জন্যে জামায়াত পার্লামেন্টের ভিতরে ও বাইরে নিরলসভাবে
প্রচেষ্টা চালাতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
সাংবিধানিক ও আইনগত
সংস্কার
সর্বশক্তিমান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে একটি
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হবে। কোরআন-সুন্নাহই হবে
প্রজাতন্ত্রের সকল আইনের উৎস। জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে
যাবতীয় কালো আইন বিশেষ করে ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন’ ও ‘জননিরাপত্তা আইন’
বাতিল করে জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে। বিচার বিভাগকে
শাসন বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করা হবে। দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনকে
এমনভাবে সংস্কার ও সংশোধন করা হবে যাতে দ্রুত ও সহজে মামলা নিষপত্তি
এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত হয়।
প্রশাসনিক সংস্কার
একটি সৎ, দক্ষ, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন গড়ে তোলা হবে
যাতে দেশের জনগণ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে দেশের বন্ধু হিসেবে
গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারী চাকুরী কাঠামো, বিধি ও
প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্বিন্যাস করে একটি স্বাধীন
ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। সকল
কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতাকেই মাপকাঠি
হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণসহ গণতান্ত্রিক
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। প্রশাসনের সকল পর্যায় থেকে
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রভূসুলভ আচরণ, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ ও দুর্নীতি
কঠোরভাবে উচ্ছেদ করা হবে।
প্রতিরক্ষা
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার
লক্ষ্যে আধুনিক সমরাস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি
শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিরক্ষাবাহিনী গড়ে তোলা হবে। প্রতিরক্ষা
শিল্পকে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান ও উৎসাহিত করা হবে। সেনা, নৌ ও
বিমান বাহিনীর জন্যে প্রয়োজনীয় আধুনিক সমরাস্ত্র সংগ্রহ করা হবে।
দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে দেশরক্ষার
জিহাদী জজবায় উজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়া হবে। দেশের ১৮ থেকে ৪৫ বছর
বয়সের প্রত্যেক সক্ষম নাগরিককে বাধ্যতামূলক সামরিক ও বেসামরিক
প্রতিরক্ষা-প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
আইন-শৃঙখলা ও সন্ত্রাস
দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে। জনগণের জান, মাল ও ইজ্জতের
নিরাপত্তা বিধান করা হবে। দলমত নির্বিশেষে অপরাধী যত বড় শক্তিশালী
হউক-তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সন্ত্রাস,
চাঁদাবাজি, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, রাহাজানি,
চোরাচালান, মাদকব্যবসা ও পাচারসহ সকল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কঠোর হস্-ে
দমন করা হবে। নিরাপরাধ লোক যাতে কোনভাবেই হয়রানির শিকার না হয়-তার
কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইন-শৃঙখলা রক্ষায় নিয়োজিত
সংস্থার সদস্য তথা পুলিশ, বি ডি আর ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের বেতন
কাঠামোর পরিবর্তন করে সম্মানজনক বেতনভাতা ও উপযুক্ত আবাসনের
ব্যবস্থা করা হবে। তাদেরকে প্রয়োজনীয় পেশাগত ও নৈতিক প্রশিক্ষণ এবং
উপযুক্ত যানবাহন ও আধুনিক উপকরণে সজ্জিত করা হবে। জনসংখ্যার অনুপাতে
দেশের থানা ও ফাঁড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে।
দুর্নীতি
অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতির পথে অন্যতম প্রধান বাধা দুর্নীতি
উচ্ছেদের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন বিভাগকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও দৃষ্টান্-মূলক শাস্-ির
ব্যবস্থা করা হবে।
শিক্ষা
শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে। নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে
জাতিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসহ সকল নাগরিকের
শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টি, প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক,
মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষাকে পর্যায়ক্রমে অবৈতনিক এবং শিক্ষার ব্যয়
হ্রাসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মহিলাদের জন্য পর্যাপ্ত
সংখ্যক স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
কারিগরি শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণাকে উৎসাহিত করা
হবে। মক্তব, মাদ্রাসা, স্কুল কলেজসহ সকল শিক্ষায়তনের
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একটি স্বতন্ত্র পে-স্কেলের আওতায় এনে সম্মানজনক
বেতনভাতা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রত্যেক গ্রামে একটি করে ফোরকানিয়া মাদ্রাসাসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক
নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, সরকারী মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রত্যেকটি বিভাগের কামিল
মাদ্রাসাসমূহ পর্যায়ক্রমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্-রিত করা হবে।
বয়স্ক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হবে। শিক্ষার সকল পর্যায়ে
তথ্য-প্রযুক্তি, কম্পিউটার বিজ্ঞানসহ সকল আধুনিক ও উন্নততর শিক্ষার
পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির ব্যবস্থা নেয়া হবে। সকল পর্যায়ে
নৈতিক এবং আদর্শিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
রেডিও, টেলিভিশন ও
গণমাধ্যম
সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং গণমাধ্যমে সুস্থ ও সৃজনশীল চিব
প্রসার ঘটানো হবে। রেডিও, টেলিভিশনসহ সকল গণমাধ্যমে জনগণের
চিন্-া-চেতনা ও মনুষ্যত্ব বিকাশে সহায়ক নৈতিকধর্মী অনুষ্ঠান প্রচার
করা হবে। সংবাদপত্রের সাংবাদিক কর্মচারীদের জন্য যুগোপযোগী বেতন
কাঠামো প্রবর্তন ও বাস্-বায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং
দক্ষতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।
অর্থনৈতিক সংস্কার
দেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বনির্ভর করার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ
গ্রহণ করা হবে। সকল নাগরিকের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা
ও বাসস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও
বেকারত্ব দূর এবং সকল প্রকার জুলুম শোষণের অবসানের লক্ষ্যে সকল
অর্থনৈতিক স্-র থেকে সুদ উচ্ছেদ করে ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে
আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন, বিত্তবানদের নিকট থেকে যাকাত সংগ্রহ করে
দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে বন্টনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মানুষের
মৌলিক অধিকারসমূহ পূরণের সর্বাত্মক ব্যবস্থা থাকবে। দেশের ভূমি,
শ্রম, মূলধন, কাঁচামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে
অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সকল
পর্যায় থেকে মজুদদারী, কালোবাজারী, চোরাকারবারী বন্ধ করে দেশীয়
শিল্পের সংরক্ষণ ও বিকাশে উপযোগী আমদানী নীতি ঘোষণা করা হবে। দেশীয়
পণ্য রপ্তানির বাজার সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং
প্রতিবন্ধকতা সমূহ দূর করা হবে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত অর্থ
যথাযথ বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা হবে। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী
করার জন্য একই সাথে চীন, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া,
সিঙ্গাপুর, ভারত, থাইল্যান্ড, পাকিস্-ান, ইরানসহ অন্যান্য
রাষ্ট্রসমূহের সাথে বাস্-বমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে।
কৃষি
দেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কৃষিখাতকে লাভজনক পেশায় পরিণত করার
জন্যে উপযুক্ত ক্ষেত্রে ভর্তুকিসহ আধুনিক কৃষি উপকরণ, বীজ, সার,
কীটনাশক কৃষকদের জন্যে সহজলভ্য করা হবে। কৃষি খাতে উৎপন্ন ফসলের
ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হবে। কৃষকদের কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ এবং
সহজশর্তে কৃষি ঋণ ও পল্লী ঋণ দেয়া হবে। চাষীদের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে
দেশব্যাপী কৃষিভিত্তিক শিল্পস্থাপনসহ মূল্যবান ফল-ফসলের সংরক্ষণ,
বাণিজ্যিক ব্যবহার ও রপ্তানীর ব্যবস্থা, অনাবাদী পতিত খাল-বিল ও
মজাপুকুর সংস্কার করে চাষযোগ্য করার ব্যবস্থা নেয়া হবে। বন্যা, খরা,
জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ী ঢল সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষার
প্রয়োজনীয় সম্ভাব্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের
জন্য পরিকল্পিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দেশের কৃষি-বনায়ন,
সামাজিক-বনায়ন এবং চা, রাবার ও ফলমূলের উন্নত চাষের ব্যাপ্তি ঘটানো
হবে।
শিল্পনীতি
শিল্পক্ষেত্রে বিরাজমান বিশৃঙখলা দূর করে শিল্পের সম্প্রসারণ,
স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং শিল্পপণ্য রপ্তানী বৃদ্ধির লক্ষ্যে
সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত
শিল্প-কারখানা স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতিরক্ষা ও
জনগুরুত্বপূর্ণ খাত ব্যতীত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানাকে
পর্যায়ক্রমে উপযুক্ত বেসরকারী খাতে হস্-ান্-র করা হবে যেখানে
জনসাধারণ ও শ্রমিক কর্মচারীদের ন্যায়সংগত অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়।
দেশের কর্মক্ষম জনশক্তিকে কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে
শিল্প-কারখানার সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হবে। গার্মেন্টস
শিল্পের বাজার সংকট দূর করে এর বিকাশে দ্রুত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা
নেয়া হবে। এক্ষেত্রে গার্মেন্টস শ্রমিকদের যথাযথ মজুরী ও
নিরাপত্তার বিষয়ে লক্ষ্য রাখা হবে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশে
প্রয়োজনীয় সরকারী সাহায্য, তাঁত শিল্পকে রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত
ব্যাংক ঋণ সুবিধা প্রদান, বকেয়া ঋণের সুদ মওকুফসহ তাঁতীদের বিভিন্ন
সমস্যার সমাধান, পাট শিল্পের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার এবং চামড়া,
চা, চিনি, লবণ ও পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ, সংস্কার, উন্নয়ন ও
আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেয়া হবে। দেশের খনিজসম্পদ ও বনজসম্পদকে
ব্যবহার করে আধুনিক বৃহত্তর পেট্রোক্যামিকেলস ইন্ডাষ্ট্রিজ, সার
কারখানা, সিমেন্ট, খাদ্য ও ফলমূল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা
হবে।
বাণিজ্যনীতি
দেশীয় শিল্পের বিকাশ, পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানী উন্নয়ন
অক্ষুণ্ন রেখে উপযুক্ত বাণিজ্যনীতি ঘোষণা করা হবে যাতে বিভিন্ন
দেশের সাথে বিরাজমান বাণিজ্য ঘাটতির অবসান এবং আমদানী-রপ্তানী
বাণিজ্য সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত হয়। বাণিজ্যনীতিতে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য
ও উৎপাদন উপকরণের আমদানীর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। অপ্রচলিত
পণ্য রপ্তানীর বিশেষ উদ্যোগসহ আঞ্চলিক ও আন্-র্জাতিক বাণিজ্যে
বিশেষ করে প্রতিবেশী ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বিশেষ বাণিজ্যিক
সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হবে।
শ্রমিক ও শ্রমনীতি
ইসলামের সুবিচারপূর্ণ বিধান এবং আইএলও কনভেনশনের সুপারিশের আলোকে
শ্রমনীতিকে ঢেলে সাজানো হবে-যাতে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে
শ্রমিকদের বোনাস ছাড়াও মুনাফার অংশ প্রদানের নীতি, নিম্নতম বেতন
কাঠামো এবং পুরুষ-নারীর বেতনভাতায় সমতা আনয়ন করা যায়। এক্ষেত্রে
শ্রমিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় পেশাগত প্রশিক্ষণ, কর্মরত অবস্থায়
দুর্ঘটনায় আহত বা নিহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং স্বল্প বেতনভোগী
শ্রমিকদের বাসস্থান, চিকিৎসা ও তাদের সন্-ানাদির শিক্ষার ব্যবস্থা
করা হবে। দেশ থেকে শিশুশ্রম উচ্ছেদ করে তাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা,
স্বাস্থ্য, বিনোদন ও সুখী পরিবেশের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা
দেশের সকল অঞ্চলকে দক্ষ পরিবহণ নেটওয়ার্কের আওতায় এনে জেলা থেকে
থানা, থানা থেকে ইউনিয়ন ও গ্রাম এবং আন্-ঃজেলা থেকে আন্-ঃথানা সড়ক
যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে
উন্নতমানের সড়ক, মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ করা হবে। বিশেষ করে পদ্মা ও
রূপসা সেতু নির্মাণের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া
হবে। পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিরাজমান অব্যবস্থা ও দুর্নীতি
দূর করা হবে। বিমান ও রেলওয়েকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে
জনগণের সর্বোচ্চ সেবাদানের জন্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করা হবে।
দেশের নৌ-ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ব্যবস্থা নেয়া হবে। নৌ-দুর্ঘটনা
রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হবে। নদী-বন্দর সমূহের সংস্কার, সংরক্ষণ
ও সম্প্রসারণের সাথে সাথে বিরাজমান সংকট দূরীকরণের ব্যবস্থা নেয়া
হবে। গরীব রিক্সা চালক, বেবিটেক্সি চালকসহ সকল পরিবহণ শ্রমিকের
জীবনের মানোন্নয়নে ও নিরাপত্তায় উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানী
ও অন্যান্য শক্তি
জাতীয় স্বার্থ ও প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের অফুরন্- তৈল ও
গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধান এবং আহরণ প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে। অব্যাহত
বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে সিস্টেম
লসের নামে দুর্নীতি ও লোড শেডিং বন্ধের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গ্রামাঞ্চলে স্বল্পতম সময়ে ক্রমান্বয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা
নিশ্চিত করা হবে। পানি সম্পদের সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত
করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তৈল এবং কয়লার সুষ্ঠু
ও পরিকল্পিত আহরণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। ভবিষ্যত প্রজন্ম এবং
দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করেই জ্বালানী শক্তির ব্যবহার ও বাণিজ্যের
দিকে মনোযোগ দেয়া হবে।
সমাজ সংস্কার ও ধর্মীয়
জীবন
ইসলামী আকিদাহ-বিশ্বাস, হুকুম-আহকাম ও নৈতিক-মূল্যবোধ শিক্ষার
মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্যে ইসলামী মৌলিক শিক্ষার
ব্যবস্থা, সালাত কায়েম করার সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ, ধর্মবিরোধী
প্রচারণা বন্ধ ও কটুক্তিকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নসহ অন্যান্য
ধর্মের লোকদের জন্যে পূর্ণ ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা নেয়া
হবে। দেশের সকল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের পর্যায়ক্রমে উপযুক্ত
সম্মানী প্রদান করা হবে। মসজিদসমূহের পানি ও বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করা
হবে। মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ উন্নয়নের
বাস্-বমুখী ব্যবস্থা নেয়া হবে। দেশের সকল জিলা ও উপজিলা পর্যায়ে
ইসলামী ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে এবং রেডিও, টিভি,
সংবাদপত্রসহ সকল প্রচার মাধ্যমে ইসলামী আদর্শ প্রচারের ব্যবস্থা
নেয়া হবে। দেশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্ম মুক্ত ও
স্বাধীনভাবে অনুসরণ এবং পালন করার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সমাজ
থেকে মদ, জুয়া ও যাবতীয় অসামাজিক কাজ, পাপাচার প্রভৃতি কঠোর হস্-ে
বন্ধ করা হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানব
সম্পদ উন্নয়ন
পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ রোধ, পরিবেশের বারসাম্য
রক্ষা ও উন্নয়নে বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ
জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বন-নিধন কঠোর
হস্-ে দমন করা হবে এবং পরিকল্পিত নতুন বনায়নে উৎসাহ ও সরকারী
আনুকূল্য দেয়া হবে। মানব সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে যুগপৎ নৈতিক ও
কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ, তাদের প্রতিভা বিকাশের
সুযোগ সৃষ্টি এবং অশিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিত কর্মক্ষম ব্যক্তিকে
ব্যাপকভাবে কারিগরী শিক্ষায় উৎসাহিত করে আত্মনির্ভরশীল করার
ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদান করা হবে। প্রত্যেক
উপজিলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন ট্রেডকোর্স ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ
কোর্স চালু করা হবে।
দারিদ্র্য বিমোচন ও
সামাজিক নিরাপত্তা
সামাজিক নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রতীক যাকাত ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক
হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। সমাজের বিত্তশালী ও স্বচ্ছল লোকদের নিকট
থেকে যাকাত ও ওশর আদায় করে বায়তুলমালের বিশেষ তহবিল গড়ে তুলে
সমাজের দরিদ্র, অক্ষম, অন্ধ, বধির, বোবা, শারীরিক ও মানসিক
প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ, ভিক্ষুক, শহরের বাস্তুহারা, বস্-িবাসী এতিম ও
গরীব শিশুদের সাহায্য ভাতা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও পুনর্বাসনের
ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পল্লী উন্নয়ন
জামায়াতে ইসলামী গ্রামে নিয়ে যেতে চায় সকল নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও
সেবা-নিরাপত্তা। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় রেখে
গ্রামের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধন, জনগণের শিক্ষা, চিকিৎসা,
কর্মসংস্থান, চিত্তবিনোদন, বেকার ও অর্ধবেকার যুবশক্তিকে উন্নয়ন
কর্মকাণ্ডের আওতাভুক্ত করা এবং সরকারী আনুকূল্যে পল্লী গৃহনির্মাণ
প্রকল্প চালু ও সুদবিহীন গৃহনির্মাণ-ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। পল্লী
এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত
করা হবে। এক কথায়, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে গ্রামগুলো হয়ে ওঠবে
উন্নয়নের নবতর কেন্দ্রবিন্দু।
চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ দেশের দরিদ্র ও পশ্চাদপদ সকল শিশু, নারী,
বৃদ্ধসহ জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয়
সুযোগ বিনামূল্যে নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। মানুষের অন্যতম
মৌলিক অধিকার চিকিৎসা সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনাসহ
গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি ঘোষণা করা হবে। স্বাস্থ্যনীতিতে মহামারী ও
সংক্রামক রোগব্যাধি প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা, অস্বাস্থ্যকর
খাদ্য ও ভেজাল ঔষধ প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ,
জনসংখ্যার অনুপাতে দেশের সকল এলাকায় আধুনিক হাসপাতাল, দাতব্য
চিকিৎসালয় ও ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা এবং আয়ুর্বেদী, ইউনানী ও হোমিও
চিকিৎসা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। পল্লী এলাকার
অবহেলিত জনগণের স্বাস্থ্য সেবার প্রতি বিশেষ নজর রাখা হবে।
জনস্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে উন্নতমানের পয়ঃপ্রণালী চালু,
পানি নিষ্কাশন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্ব দে |